ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক মতিঝিল থেকে এবার জাতীয় সংসদে গড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক থেকে নিয়মবহির্ভূত ঋণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার তদন্ত করার কথা বলা হয়েছে। অপরদিকে বিরোধী দল ব্যাংকটির চেয়ারম্যানকে এস আলমের দোসর আখ্যায়িত করে তার অপসারণ দাবি করেছে।
বিধি-৬৮-তে বিরোধীদলীয় নেতার জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উত্থাপনীয় বিষয় ছিল ‘দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সকল প্রকার অন্যায়, অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থে আলোচনা।’
নোটিস উত্থাপনের সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির দিকে আবারও ‘দখলকারী চক্রের’ নজর পড়েছে।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। রাজনৈতিক হয়রানি ও অপপ্রচারের মধ্যেও ২০১৬ সালে ব্যাংকটি ৪৪৭ কোটির বেশি মুনাফা অর্জন করেছিল এবং সে সময় খেলাপি বিনিয়োগের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। পরবর্তীতে তৎকালীন সরকার বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ব্যাংক লুটপাট করে, যার ফলে ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে চরম অব্যবস্থা চলছে। ৮৯ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন। অন্যদিকে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আমানতকারীরা।
তিনি বলেন, এ দেশে রিজার্ভ চুরির মতো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ডিজিএফআইয়ের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এস আলম গ্রুপের কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বলা হয়, ইসলামী ব্যাংককে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। এটি কেন বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাংক হবে? আবদুল আউয়াল মিন্টু সাহেব একটি ব্যাংকের কর্ণধার, আমরা কি সেটাকে বিএনপির ব্যাংক বলব? মির্জা আব্বাস ঢাকা ব্যাংকের ডিরেক্টর, সেটা কি বিএনপির ব্যাংক? কিংবা প্রয়াত আবদুল জলিল সাহেব যে ব্যাংকের ডিরেক্টর ছিলেন, সেটাকে কি আমরা আওয়ামী লীগের ব্যাংক বলব?
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জোরপূর্বক দখল করা শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিয়ে সৎ লোকদের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালনা করা না হলে ৩ কোটি গ্রাহক রাস্তায় নামবে এবং দেশে বড় ধরনের গণআন্দোলন তৈরি হবে।
বর্তমান চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি একজন পরীক্ষিত দুর্নীতিবাজ এবং অর্থ আত্মসাৎকারী। এরা এস আলমের মতোই জনগণের বাকি টাকা লুট করে নিয়ে যাবে। এ কারণেই গ্রাহকদের মধ্যে বিরাট আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল কিংবা চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পূর্ণ রেগুলেটরি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইবনে সিনার মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার ব্লক মার্কেটে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করার রেকর্ড রয়েছে। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে ব্যাংকের প্রায় ৮১ থেকে ৯২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। কোন শেয়ারহোল্ডার কীভাবে এই শেয়ার খরিদ করেছেন, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা আইনি তদন্তের ওপর জোর দেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প’ বা আরডিএসের আওতায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পে এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে। নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য নারীদের মাঝে ১০ হাজার টাকা করে বিতরণ করে ‘কোরআনের দল’ হিসেবে ভোট চাওয়ার রাজনৈতিক প্রচারণারও সমালোচনা করেন তিনি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো সঠিক হদিস নেই এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত করে টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা লোন নিয়ে ফেরত না দেওয়া নাবিল গ্রুপ, নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা লোন নেওয়া লান্তাবোর গ্রুপসহ সুনির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের ঋণ অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, ব্যাংকটি জোরপূর্বক দখলের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, যারা বর্তমানে রাস্তায় আন্দোলন করছেন। এর বিপরীতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ৬ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভেঙে বেআইনি চাকরিচ্যুতির শিকার কর্মীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় হওয়া নিয়োগগুলোর বৈধতা তদন্তের কথা জানান তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ বা তদন্ত প্রমাণিত হয়নি, নতুন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তা তদন্ত করা হবে। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দলের কর্মকা-কে ইসলামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয় এবং সব কিছুতেই ‘ইসলামের ওপর হাত দেবেন না’ বলে দোহাই দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামী নাকি ব্যাংকের মালিক না। আবার তারা বলছে ইসলামের ওপর হাত দিবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়। সুতরাং সব কিছুতেই ইসলামের ওপর হাত দেবেন না দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।
প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংকটির শেয়ার ডাকাতি করা হয়েছিল, অবিলম্বে তাদের কাছে সেই শেয়ার ফিরিয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, এই ব্যাংক থেকে এস আলম তার নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। আর সমুদয় যে শেয়ার তিনি কিনেছেন, যার মাধ্যমে তিনি ৮২ শতাংশের মালিক হয়েছেন, সেগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি শুধু কইয়ের তেল দিয়ে কই ভাজেননি, শোল মাছও ভেজেছেন।
ব্যাংকটিতে অবৈধ নিয়োগ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘১০ হাজার কর্মচারীকে সামান্য কোনো নিয়মনীতি না মেনে ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের আবার পরীক্ষায় বসার জন্য ডাকা হলেও তারা কেউ আসেনি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর করা এক অভিযোগের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ৭০০ কোটি টাকার লোন কোনো একটি দলের নির্বাচনী ফান্ডে যাওয়ার কথা বলেছেন। উনি যদি এর দ্বারা জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়ে থাকেন, তবে আমি চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি মেডেল দেব।
ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংকটিকে ধ্বংস করেছেন। সেই এস আলম আবারও ফিরে আসার প্রমাণ হলো বর্তমান চেয়ারম্যান। এমন একজন অসৎ লোককে একটি বিধ্বস্ত ব্যাংকের মাথার ওপর বসিয়ে দেওয়া কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, বাস্তবতার ভিত্তিতে এই ব্যাংকটিকে বাঁচাতে হবে। এই ব্যাংক আগের জায়গায় ফিরে এলে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে।’
আলোচনার শেষ ভাগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভবিষ্যৎ বিএনপি সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ ব্যাংকটির গোড়াপত্তন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাই এর মর্যাদা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা উচ্ছৃঙ্খলতা সহ্য করা হবে না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের চরিত্র নিয়ে বিরোধী দল থেকে যেসব বক্তব্য এসেছে, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে অনিয়মের কোনো প্রমাণ পায়নি।
মন্ত্রী বলেন, প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে একটি উগ্র গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মিছিল ও বিশৃঙ্খল কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই উচ্ছৃঙ্খলতার সঙ্গে বিরোধী দলের আশঙ্কার একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত কিছু অশুভ শক্তি ইসলামী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করে দিয়ে দেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায় এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
দেশের মানুষকে হতাশ করে এমন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও আগামী বাংলাদেশ গড়ার শপথ থেকে নির্বাচিত বিরোধী দলকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করার এবং তুচ্ছ ইস্যু নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।