ত্রিশালে নতুন সেতু নির্মাণ হলেও মানুষ সেতুটির সুফল ভোগ করতে পারছে না

আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

নদীর ওপর নড়বড়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটি বেইলি সেতু। এই সেতুটি দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে ছোট ছোট বিভিন্ন যানবাহন। পথচারীদের একমাত্র ভরসা এই সেতুটিই। তবে এই সেতুটি পারাপারেই সবচেয়ে আতঙ্কে থাকেন বয়োবৃদ্ধ ও স্কুলের শিশুরা। কারণ, সেতুতে উঠলেই তিন চাকার যানবাহনের চাপে পাটাতনের কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়। এছাড়া পাটাতন ভেঙে তৈরি হওয়া গর্তগুলোও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

ওই বেইলি সেতুটির অবস্থান ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ী বাজারে। ঝুকিপূর্ণ এই সেতুটি মানুষদের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। এই কাটার ব্যাথা সাড়াতে উদ্যোগও নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। চলাচলে স্থানীয়দের ভোগান্তি নিরসন করতে পাশেই আরেকটি সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে সবাই অপেক্ষায় ছিল- কবে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে, কবেই বা নতুন সেতু দিয়ে ঝুঁকি ছাড়াই পারাপার হয়ে গন্তব্যে যাওয়া যাবে। এমন আশার মাধ্যমেই নতুন সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। এই জটিলতা এখনো চলছে। মানুষও সেতুটির সুফল ভোগ করতে পারছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বেইলি সেতুটির অনেক অংশের পাটাতন ভেঙে গেছে। কোনোরকমে ছোট যানবাহনগুলো যাচ্ছে। বিভিন্ন বয়সী পথচারীসহ স্কুল- কলেজের শিক্ষার্থীরাও বাধ্য হয়ে সেতুটি পারাপার হচ্ছে। এতে যেকোনো মুহুর্তে বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেইলি সেতুটির পাশেই নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়া আরেকটটি সেতু রয়েছে। তবে সেতুর সামনের একপাশে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় শেষ মুহুর্তের কাজ আটকে আছে। সেতু থেকে মূল সড়কে ওঠার জমিটি অধিগ্রহণ জটিলতায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ঝুকিপূর্ণ বেইলি সেতুটিই সবার একমাত্র ভরসা।

স্থানীয়রা জানান, খিরু নদীর এক পাশে ত্রিশাল উপজেলা, অন্য পাশে ফুলবাড়িয়া উপজেলা। এই নদীর ওপর আশির দশকে নির্মিত হয়েছিল বেইলি সেতুটি। তিন যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া সেতুটি যানবাহনের ভার আর সইতে পারছে না। ৪ বছর আগে এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে এলজিইডি বেইলি সেতুটির পাশেই একটি সেতু নির্মাণকাজ শুরু করে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন না হওয়ায় নির্মাণাধীন সেতুটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।  ফলে প্রতিদিন দুই উপজেলার লাখ মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে বেইলি সেতু পার হতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেই বেইলি ব্রিজের পাশেই প্রায় ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রকল্পটির কাজ পায় এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দুই দফা সময় বাড়িয়েও কাজ শেষ হয়নি।

মঠবাড়ী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া জানায়, নদীর ওপর বেইলি সেতুটিই একমাত্র ভরসা। এই সেতুতে ওঠার পর পরই ভয় শুরু হয়। মনে হয় এই বুঝি সেতুসহ কিংবা পাটাতনসহ নিচে পড়ে যাবে। তবুও আতঙ্ক নিয়ে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে পাশেই নির্মিত হওয়া সেতুটি দ্রুত চলাচলের উপযোগী করা প্রয়োজন।

মকবুল হোসেন নামের একজন বয়োবৃদ্ধ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভাঙাচোরা বেইলি সেতুটি পারাপার হতে গিয়ে পায়ে কয়েকবার ব্যথা পেয়েছি। মাঝেমধ্যেই অটোরিকশা উল্টে যায়। ভাঙা পাটাতনে পড়ে অনেকেই আহত হয়েছেন। তবুও পাশের সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে না। আমাদের দুর্ভোগের কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করছে না।

অধিগ্রহণ জটিলতায় রয়েছে সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি। প্রতি শতাংশ জমির মূল্য দাবি করা হয় ২৫ লাখ টাকা। ওয়ারিশানসহ জমির মালিক ২০-২২ জন। তাদের একজন বাসন্তী রানী চৌধুরী। তিনি বলেন, জমি অধিগ্রহণে আমার তিন শতকের ভিটে পড়েছে। অধিগ্রহণের টাকা পাইনি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জমি ছাড়া হবে না। 

প্রায় ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে অল্পসময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে বলে জানিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন। এ বিষয়ে এলজিইডির ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ করার কথা থাকলেও জমির মালিকদের বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারা অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত শুধু তাদের জমির অংশেই নয়, প্রকল্পের অন্যান্য অংশেও কাজ করতে দিচ্ছেন না। ওই অংশের কাজ সম্পন্ন করা গেলে সেতুটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হতো। 

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী জানান, মঠবাড়ি ইউনিয়নের দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম পোড়াবাড়ি ব্রিজটি। পুরোনো সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় পাশে একটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ব্রীজ নির্মাণের শুরুতে জমি অধিগ্রহণ করে সংযোগ সড়ক তৈরি না করায়, এটি এখনো জনগণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংযোগ সড়কের জন্য দুই পাশের জমি অধিগ্রহণ ও পরিমাপের কাজ শেষ হয়েছে। পরিমাপ অনুযায়ী জমির মূল্য নির্ধারণ করে অতিরিক্ত বাজেটের একটি প্রস্তাবনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অতি শীঘ্রই ব্রিজটি চালু করা সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত