ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে এবার বিশ্বকাপে রদ্রিগো

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

কার্লো আনচেলত্তির অধীনে থাকা ব্রাজিল দলের ওপর এবং নিজের ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে লন্ডনের গার্ডিয়ানে লেখা রদ্রিগোর কলামটি দেশ রূপান্তর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

আমি এই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছি বিশ্বকাপের মাঠে সেলেসাওদের (ব্রাজিল দল) কিছু ম্যাচ গ্যালারিতে বসে দেখার জন্য। গত মার্চ মাসে হাঁটুতে যে চোট পেয়েছিলাম, তা থেকে সেরে ওঠার জন্য আমার প্রতিদিনের চিকিৎসা বা রিহ্যাব চলতেই থাকবে। তবে এই রুটিনের মাঝেই আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপায়ে বিশ্বকাপকে উপভোগ করার চেষ্টা করব। ওসাস্কোর (সাও পাওলো রাজ্যের একটি শহর) সেই সাধারণ ছেলে রদ্রিগো বোঝে যে গ্যালারিতে বসার সুযোগ পাওয়াটাও কত বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু খেলোয়াড় রদ্রিগো—যে পুরো বাছাইপর্ব, কোপা আমেরিকা এবং অন্যান্য সব ম্যাচ খেলে এসেছে—তার মনের ভেতরের অনুভূতিটা প্রকাশ করা আসলেই কঠিন।

২০২২ বিশ্বকাপের সেই শেষ ম্যাচের কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ যখন আমার পেনাল্টি শটটা আটকে দিল এবং আমরা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়ে গেলাম, তারপর থেকে কত রাত যে আমার চোখে ঘুম আসেনি! শুধু একটা স্বপ্নই আমার মাথায় ঘুরত—আবারও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপে ফিরতে হবে।

গত চার বছরের পথচলাটা আমাদের কারও জন্যই সহজ ছিল না। আমরা খেলোয়াড়, কোচ, টিম স্টাফ, সিবিএফ (ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন) কর্মকর্তা এবং অবশ্যই সমর্থকরা—সবাইকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই দল ঘোষণার ঠিক কয়েক মাস আগে এমন একটা চোট পাওয়া, যা আমাকে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে দিল, তা ছিল এক মস্ত বড় ধাক্কা। যে স্বপ্নের পেছনে আমি আমার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছি, তা এক নিমেষেই হাতছাড়া হয়ে গেল।

এমআরআই স্ক্যান করার পর যখন ইনজুরির ভয়াবহতা জানতে পারলাম, তখন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অস্ত্রোপচারের ওই সপ্তাহটা ছিল তীব্র যন্ত্রণার—কত বিনিদ্র রাত, অসহ্য ব্যথা, আর বমি বমি ভাব বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। কিন্তু খুব দ্রুতই আমার ভেতর থেকে একটা শক্তি জেগে ওঠে; মনে একটা বিশ্বাস আসে যে জীবন এখানেই থেমে থাকে না। আমি ঠিকই সুস্থ হয়ে উঠব এবং আমার বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণের লড়াই চালিয়ে যাব।

তাছাড়া, আমার জীবনের অন্যতম সেই খারাপ দিনটি চারপাশের মানুষের ভালোবাসায় এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছিল। আমার বিশ্বাস আমাকে শক্তি দিয়েছে, আর সবসময় পাশে ছিল আমার পরিবার। পাশাপাশি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের অজস্র মেসেজ আর কথাবার্তা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব থেকে অবিশ্বাস্য সমর্থন পেয়েছি, সিবিএফ এবং জাতীয় দলের স্টাফ ও খেলোয়াড়রা ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন। আমি নিশ্চিত যে আমি আরও শক্তিশালী হয়ে মাঠে ফিরব এবং নিজের লক্ষ্য পূরণে আগের মতোই নিজেকে উজার করে দেব।

চোট থেকে ফেরার প্রক্রিয়ায় রদ্রিগো

রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মৌসুমের শেষদিকের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো খেলতে না পারা এবং ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারার কষ্টটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মাঠে নেমে ক্লাবের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিতে না পেরে টিভির পর্দায় রিয়াল মাদ্রিদের ওই বাঁচা-মরার ম্যাচগুলো দেখা ছিল খুবই তিক্ত এক অভিজ্ঞতা। একইভাবে, কার্লো আনচেলত্তির মুখে নিজের নাম শোনার কোনো আশা ছাড়াই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা দেখার অনুভূতিটা ছিল ভীষণ কষ্টের।

অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদ এবং ব্রাজিলের জার্সি গায়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তাও মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এত বড় ধাক্কা খাওয়ার পরেও আমি বিশ্বাস করি, আমার সামনে এখনও দারুণ সব অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে। আমি ক্লাব বা দেশ—সব জায়গার সমর্থকদের মুখে আবারও হাসি ফোটাতে পারব। আমার বয়স এখন মাত্র ২৫ বছর, এখনও অনেক বড় বড় স্বপ্ন পূরণ করা বাকি। আর আমি জানি, এর জন্য আমাকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে, যেমনটা আমি আমার জীবনের অন্যান্য কঠিন মুহূর্তগুলোতে থেকেছি।

ব্রাজিল জাতীয় দল মানেই এক বুক গর্ব। আমি একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে গর্ব বোধ করি এবং এমন একটা দলকে সমর্থন করি যারা আমাদের সংস্কৃতিকে সুন্দর, জাদুকরী, আনন্দময়, ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে জড়ানোর অনুভূতি আসলেই অন্যরকম।

এই গর্বের শুরু ওসাস্কোর সেই ছোট ছেলেটি থেকে, যে ব্রাজিলের একটা নকল জার্সি গায়ে দিয়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। আর সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন তা শুধু আমার একার থাকে না; তা জড়িয়ে যায় আমার পরিবার, বন্ধু, আমার ম্যানেজমেন্ট টিম, ভক্ত এবং সতীর্থদের সাথেও।

গ্যালারিতে বসে মাঠে ব্রাজিলের খেলা দেখার আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ। করিন্থিয়ান্স অ্যারেনায় বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ব্রাজিল ৩-০ গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়েছিল (গোল করেছিলেন নেইমার, কুতিনহো আর মার্সেলো)। তার আগে জাতীয় দলের খেলা সরাসরি দেখার মতো সামর্থ্য আমাদের ছিল না। বাবার সাথে সেবার খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। স্টেডিয়ামের পরিবেশটা ছিল অসাধারণ, এক অন্যরকম শক্তি! ক্লাবের রেষারেষি ভুলে সব দলের সমর্থকরা সেদিন এক হয়ে গলা ফাটাচ্ছিল। ওটা এমন এক মুহূর্ত যখন আমরা সবাই একই রঙে রঙিন হয়ে যাই।

২০২২ বিশ্বকাপে রদ্রিগো

যখন আমার নিজের গায়ে এই জার্সি জড়ানোর সময় এলো, তখন আমি সমর্থকদের সেই ভালোবাসা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি। তা আমাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেত, মনে করিয়ে দিত টিভির সামনে বসে খেলা দেখার দিনগুলোর কথা। আমরা সবসময় চাই আমাদের জাতীয় দল ট্রফি জিতুক, তবে আমি বুঝতে পেরেছি যে দলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা শুধু জেতার ওপর নির্ভর করে না। মানুষ এই দলের অংশ হতে চায়—একটু হাত নাড়ানো, একটা ছবি তোলা বা একটা জড়িয়ে ধরার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। তারা বাসের ভেতর খেলোয়াড়দের এক নজর দেখার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। পুরো ব্রাজিল চায় জাতীয় দল যেন তাদের শহরে গিয়ে খেলে। আমি বেলেম, ব্রাসিলিয়া, কুইয়াবা, সাও পাওলো, কুরিতিবা বা রিও ডি জেনিরো—যেখানেই গিয়েছি, সব জায়গার মানুষ আমাকে দারুণভাবে আপন করে নিয়েছে।

আমি যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছি দলের একদম কাছাকাছি থাকতে, সতীর্থ আর স্টাফদের সাথে দেখা করে তাদের মনে সাহস জোগাতে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আমি যাচ্ছি ব্রাজিলের একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে। খেলা যখন শুরু হবে, আমার বুক দুলবে, খেলায় বুঁদ হয়ে থাকব, ট্যাকটিক্স খেয়াল করব আর মনেপ্রাণে চাইব ব্রাজিল যেন গোল দেয়। আর গোল হলে আনন্দের সাথে মনে একটা স্বস্তি আসবে, কারণ আমি জানি পুরো দেশ সেলেসাওদের কাছ থেকে বিশ্বকাপ জয় ছাড়া আর কিছুই আশা করে না।

বিশ্বকাপ মানে শুধু মাঠের ওই ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এর জন্য প্রয়োজন শতভাগ মনোযোগ, প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রম, ম্যাচের আগে-পরে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সবার সমর্থন। আর আমি নিশ্চিত, আমাদের এই ব্রাজিল দলের মাঝে তার সবকিছুই আছে। সবচেয়ে বড় কথা, আনচেলত্তির ওপর আমাদের পুরো আস্থা আছে।

ফুটবল দুনিয়া তাঁর ট্রফি জেতার ইতিহাস সম্পর্কে ভালো করেই জানে। তবে আমি আলাদা করে বলতে চাই, এই খেলোয়াড়রা আনচেলত্তির মতো একজন অসাধারণ মনের মানুষকে পাশে পেয়েছে। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি আমার কঠিন সময়ে সবসময় বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত, পাশে দাঁড়িয়েছেন সবচেয়ে বড় সংকটে। তিনি সত্যিই অনন্য। আধুনিক ফুটবলের এই তীব্র চাপের পরিবেশ কীভাবে সামলাতে হয় তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন এবং ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়ে তিনি কী করছেন, তা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা আছে।

এখন শুধু বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার অপেক্ষা!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত