কয়েক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে সোহেলী ইসলাম সোমার (৪২)। এরপর থেকে একমাত্র মেয়ে সোমাইয়া আলমকে নিয়ে রাজধানীর ধানম-িতে বসবাস করতেন। মেয়েই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আর মেয়ে সোমাইয়া আলমেরও একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিলেন মা। কিন্তু ঘাতক ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন মা’কেও হারাতে হয়েছে।
মাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্নাতক শিক্ষার্থী সোমাইয়া। ভেঙে পড়েছেন মানসিকভাবে। তাকে সান্ত¡না দেওয়ার ভাষাও যেন কারও জানা নেই। এদিকে, এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলেও জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোহেলীর বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়। তিনি এসকেএফ ওষুধ কোম্পানিতে মেডিকেল সার্ভিস অফিসার পদে চাকরি করতেন।
সোহেলীর মামাতো ভাই সারওয়ার পারভেজ জানান, কয়েক দিন আগে পার্বতীপুরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েসহ যোগ দিয়েছিলেন সোহেলী। অনুষ্ঠান শেষে গত ৬ জুন রাত ৯টার বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। পরদিন রবিবার ভোর পাঁচটায় গাবতলী এলাকায় নেমে কাউন্টারে অপেক্ষা করছিলেন। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর রিকশা নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেট পার হতেই মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করে। এতে সোহেলী রিকশা থেকে পড়ে যান। তখন তার মাথার পেছনের অংশ ফেটে যায়। প্রচ- রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অনেকের কাছে সাহায্য চান। প্রথমে কেউ এগিয়ে না এলেও পরে রিকশাচালকসহ একজনের সহায়তায় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ধানম-ির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার সকালে মারা যান সোহেলী ইসলাম। মরদেহ পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পশ্চিম টেংরিপাড়া এলাকায় তার নানাবাড়িতে দাফন করা হয়।
সোহেলী ইসলামের চিকিৎসাসেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি পুলিশকেও অবহিত করেনি সোহেলীর পরিবারের কেউ। রাজধানীতে ছিতাইকারীর কবলে পড়ে নারীর মৃত্যুর খবর গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। পরে মৃতের পরিবারের সঙ্গে পুলিশ যোগাযোগ করলে সোহেলীর মামা মো. লিটন গতকাল শনিবার শেরেবাংলা নগর থানায় হাজির হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা দুইছিনতাইকারীসহ সহযোগী কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। সোহেলীর মামা লিটন বলেন, তার বাবা-মা কেউ জীবিত নেই। কয়েক বছর আগে তার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর থেকে একমাত্র মেয়েকে নিয়েই থাকত। মেয়েকে নিয়েই বাকি জীবন অতিবাহিত করতে চেয়েছিল। নিজের চাকরির পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনা, যাবতীয় খরচ, সখ আহ্লাদ পূরণ করত। মেয়েকে কখনো বাবার অভাব অনুভব করতে দেয়নি। কিন্তু ওর (সোহেলী) এভাবে চলে যাওয়াটা কেউ মানতে পারছে না। মেয়েটা (সোমাইয়া) মায়ের শোকে ভেঙে পড়েছে। কান্না করেই যাচ্ছে। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ওর ভবিষ্যতটা একেবারে অন্ধকার হয়ে গেছে।’ আর কথা বলতে পারছিলেন না লিটন।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি কয়েকদিন আগের; আমাদের কেউ জানায়নি। গতকাল মামলা হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছি। ঘাতকদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ তিনি বলেন, ছিনতাইকারীরা চেষ্টা করলেও সোহেলী ইসলামের ব্যাগ নিতে পারেনি। হাতে পেঁচানো থাকার কারণে ছিনতাইকারী টান দেওয়ায় তিনি রিকশা থেকে পড়ে পরে মারা যান।