দুপুরের কড়া রোদে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর বাজারের এক কোণে কাঠ খোদাইয়ের কাজে ব্যস্ত মো. ওমর ফারুক। ফার্নিচারের নকশার কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন তিনি একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন তার কপালের ভাঁজ আর ক্লান্ত চোখের কোণে বয়সের ছাপ ছিল স্পষ্ট। দেশের জাতীয় বাজেট নিয়ে প্রশ্ন করতেই একচোট হেসে ওঠেন তিনি। বললেন, ‘বাজেট বুঝি না ভাই’— সংক্ষিপ্ত উত্তর তার। কিন্তু পরক্ষণেই বলে যান চাল, তেল, ডাল আর সবজির বাড়তি দামের কারণে টিকে থাকার সংগ্রামের কথা। অর্থনীতির জটিল হিসাব না বুঝলেও বাজারের নির্মম বাস্তবতা তিনি অনুভব করেন প্রতিদিনই। তাই বাজেট নিয়ে তার প্রত্যাশাও সহজ- নিত্যপণ্যের দাম কমুক, গরিব মানুষের জীবনটা একটু সহজ হোক। দু'মুঠো খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারলেই খুশি তিনি।
ছেংগারচর এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই সংসার চালাচ্ছেন। বয়সের ভার শরীরে স্পষ্ট হলেও জীবিকার প্রয়োজন তাকে এখনো বাধ্য করে কাজ করতে। পরিবারে স্ত্রী ও তিন ছেলে। ছেলেরা কাজ করলেও তাদের আয়ে সংসার চলে না।
ওমর ফারুকের ভাষায়, জীবন এখন হিসাব মেলাতে না পারার গল্প। ‘তেল কিনলে পারি না তরকারি কিনতে। আবার চাল কিনলে তেল কিনতে পারি না। সবকিছুর দাম বাড়তেছে। আমরা গরিব মানুষ কেমনে চলব’– আক্ষেপ তার। তিনি মনে করেন, জাতীয় বাজেটে বড় কোনো ঘোষণা নয়, সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। 'সরকার যদি চাল আর তেলের দামটা কমাতে পারে, তাহলে আমরা পেট ভরে দুই বেলা খেতে পারব। দু'মুঠো খেয়ে-পরে বাঁচতে পারলেই খুশি'— বলেন এমন প্রত্যাশার কথা।
বাজেটে প্রতি বছর তুলে ধরা হয় হাজার হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকার প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এই বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেটের নাম দিয়েছেন, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা'।
কিন্তু ওমর ফারুকের মতো প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের কাছে বাজেটের সফলতা মাপা হয় অন্যভাবে। তাদের প্রশ্ন- বাজারে গিয়ে আগের চেয়ে কম দামে চাল পাওয়া যাবে কি? রান্নার তেলের বোতল কেনা সহজ হবে কি? সবজি ও ডালের দাম নাগালের মধ্যে থাকবে কি? অবসরে কখনো কখনো চায়ের দোকানে বসে টেলিভিশনে সংসদের অধিবেশন দেখেন ওমর ফারুক। এমপি-মন্ত্রীরা ভাষণ দেন। ‘আমরা গরিব মানুষ এত জেনে কী হবে’— বলেন তিনি। এরপর কিছুক্ষণ থেমে নিজের প্রত্যাশার কথা বলেন— ‘দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের চাওয়া, জিনিসপত্রের দাম যেন কম থাকে।’