জার্মানির জীবন অতিষ্ট করে দিতে চায় পুচকে কুরাসাও

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

সময়টা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর। কনকাকাফ নেশনস লিগের ম্যাচ খেলতে ত্রিনিদাদ থেকে মার্টিনিক যাবে কুরাসাও  জাতীয় ফুটবল দল। কিন্তু ম্যাচ ডে-তে দেখা দিল চরম বিপত্তি—কোনো চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা নেই! শেষমেশ একটা ছোট্ট প্রপেলার (পাখাওয়ালা) বিমান ভাড়া করা হলো। সেই খুদে বিমানে করে মাত্র ৬ জন করে খেলোয়াড় দফায় দফায় ওপার করা হতে লাগল।

ম্যাচ শুরুর আগে মূল একাদশের ১১ জন কোনোমতে মাঠে পৌঁছাতে পারলেও বদলি খেলোয়াড়রা যখন ভেন্যুতে নামলেন, ততক্ষণে খেলা শুরু হয়ে গেছে। আরও বড় বিপত্তি হলো, তাদের লাগেজ পৌঁছায়নি। বুট, শিন গার্ড আর একজোড়া মোজা ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুই ছিল না! সেই ম্যাচে ৯১৩ জন দর্শকের সামনে ১-০ গোলে হেরেছিল কুরাসাও।

সেই ঘটনার তিন বছরও কাটেনি। আজ যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির মুখোমুখি হচ্ছে সেই কুরাসাও! ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যা (মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার) এবং আয়তন (১৭১ বর্গমাইল) উভয় দিক থেকেই কুরাসাও হচ্ছে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ছোট দেশ।

কুরাসাওয়ের এই রূপকথার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ থাকা এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ২০১০ সালে স্বায়ত্তশাসন পায় এবং ২০১১ সালে ফিফার সদস্যপদ লাভ করে। ২০০৩ সালের দিকে যখন ডাচ দ্বিতীয় বিভাগের খেলোয়াড় অ্যাঞ্জেলো সিন্তজে ও ভাউটার জানসেনকে কুরাসাওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফোন করে বড় টুর্নামেন্টে খেলার স্বপ্নের কথা বলেন, তখন পরিস্থিতি ছিল একেবারেই অপেশাদার।

বর্তমানে দলটির পারফরম্যান্স কোচ সিন্তজে সেই দিনগুলোর কথা মনে করে হাসেন, "আমাদের কোনো নির্দিষ্ট ট্রেনিং কিট ছিল না। আমি খেলতাম লাল মোজা পরে, আমার পাশের জন নীল মোজা। কেউ নাইকি পরত, কেউ অন্য ব্র্যান্ড। হোটেল ঠিকঠাক ছিল না, অনুশীলনে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। সেখান থেকে আজ আমরা এখানে।"

২০১৫ সাল থেকে সাবেক ডাচ কিংবদন্তি প্যাট্রিক ক্লুইভার্টসহ একাধিক ডাচ কোচ দলটির দায়িত্ব নেন। ক্লুইভার্টের মা ছিলেন কুরাসাওয়ের নাগরিক। এরপর ডাচ যুব দলে খেলা অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার কুরাসাওয়ের হয়ে খেলতে রাজী হন, যাদের অন্যতম বর্তমান এক নম্বর গোলরক্ষক এলোয় রুম।

কুরাসাওয়ের এই বিশ্বকাপ যাত্রার পেছনে জড়িয়ে আছে এক চরম ট্র্যাজেডি ও আবেগ। ২০১৯ সালে জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকাকালীন আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দলটির অন্যতম গোলরক্ষক জাইরজিনহো পিটার। ড্রেসিংরুমে প্রতিদিনের প্রার্থনার নেতৃত্ব দিতেন তিনি।

পিটারের সেই অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে নিয়েই এবার মাঠে নেমেছে পুরো দল। বর্তমান অধিনায়ক লিয়্যান্ড্রো বাকুনা প্রতিটি ম্যাচের আগে পিটারের একটি নেকলেস ড্রেসিংরুমের বৃত্তের মাঝে রেখে দেন।

বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে জ্যামাইকার বিপক্ষে ০-০ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপের টিকিট কাটে কুরাসাও। সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গোলরক্ষক এলোয় রুম বলেন, "জ্যামাইকার বিপক্ষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে বল আমাদের পোস্টে লেগে ফিরে আসে, কিন্তু গোল হয়নি। কুরাসাওয়ের মানুষ বিশ্বাস করে, সেদিন গোলপোস্টে আমি একা ছিলাম না; আমাদের কিংবদন্তি প্রয়াত গোলরক্ষক এরগিলিও হাতো এবং আমার বন্ধু মৃত পিটারও সেদিন আমার সাথে গোলপোস্ট পাহারা দিচ্ছিল। আমরা মূলত তিনজন মিলে সেদিন গোল ঠেকিয়েছি। এই বিশ্বকাপটা পিটারেরই স্বপ্ন ছিল।"

আজকের কর্পোরেট ফুটবলের যুগে কুরাসাও দলটির সরলতা ফিফাকেও অবাক করেছে। তারা কোনো ভিআইপি চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করে না, সাধারণ কমার্শিয়াল ফ্লাইটে যাতায়াত করে এবং সাধারণ মানুষের মতোই বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করে।

ফিফা যখন তাদের জিজ্ঞেস করেছিল, বিশ্বকাপে তাদের হোটেলের জন্য আলাদা প্রবেশপথ বা বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে কি না, দলের সমন্বয়ক জানসেন সাফ জানিয়ে দেন, "আমাদের কোনো নিরাপত্তার দরকার নেই। আমরা লবি দিয়ে সাধারণ মানুষের মতোই ঢুকব। কেউ ছবি তুলতে চাইলে বা অটোগ্রাফ চাইলে আমরা সানন্দে দেব। আমাদের অনুশীলনের পর সমর্থকরা চাইলে মাঠে এসে আমাদের সাথে মিশতেও পারে।"

ফ্লোরিডার বোকা রাটনে কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ ক্যাম্পে ফুটবলারদের পরিবার ও বন্ধুদেরও থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জানসেনের মতে, *"অনেকে ভাবতে পারেন আমাদের এই সেটআপ অপেশাদার। কিন্তু আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অত্যন্ত প্রফেশনাল। আমরা এখানে এসেছি মুখে হাসি নিয়ে, ফিরেও যাব হাসি মুখে। বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারাটাই আমাদের জন্য বিশ্বকাপ জয়ের সমান।"*

কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের অধীনে কুরাসাওয়ের এই বিশ্বকাপ যাত্রা কেবল তাদের ফুটবলেই নয়, দেশটির পর্যটন এবং অর্থনীতিতেও এক বিশাল বিপ্লব এনে দিয়েছে।

আজ জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে তাদের আসল লড়াই। কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের মতে চাপটা আসলে জার্মানির ওপরই বেশি, ‘জার্মানির মতো বিশাল এক শক্তির বিপরীতে আমরা খুবই ছোট একটি দেশ। তবে আমরা তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলব। আমরা খুব অপ্রীতিকর একটি দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে চাই, যাদের হারানো সহজ নয়।‘

ফল যাই হোক না কেন, কুরাসাও প্রমাণ করেছে—বড় স্বপ্ন আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। বিশ্বের কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় ইতিমধ্যেই জিতে নিয়েছে ক্যারিবীয় সাগরের এই ছোট্ট দ্বীপদেশটি।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত