প্রচ্ছদ রচনা

আধুনিক মানুষের পতন ও উকিল মুন্সীর গান

সাধারণত দেহতাত্ত্বিক গানকে আমরা আধ্যাত্মিক রূপক বা গূঢ় সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই লেখায় দেখা যাবে, উকিল মুন্সীর কাছে দেহ, কামনা, বিচ্ছেদ বা মৃত্যু কোনো প্রতীকী ভাষারূপে ছিল না; ছিল মানুষেরই বাস্তব, ভঙ্গুর ও অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতার উপাদান হিসেবে। তার গানে মানুষ সর্বশক্তিমান আধুনিক সত্তা নয়; বরং প্রকৃতি, কামনা, স্মৃতি ও মৃত্যুর অনিশ্চয়তার মধ্যে দুলতে থাকা এক অরক্ষিত প্রাণ। উকিল মুন্সী আধুনিক মানুষের আত্মগরিমাকে প্রশ্ন করেন এবং দেখান, মানুষ এক বহমান স্রোত যেখানে দেহ ও জগৎ আলাদা নয়

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

বাংলা দেহতাত্ত্বিক সংগীতের হাল আমলের যে পাঠ (বিশেষত মধ্যবিত্ত জোনের) সেখানে একটি লক্ষণীয় প্রবণতা হলো, দেহকে সেখানে প্রায়শই রূপক হিসেবে পাঠ করা হয় আর কামনাকে এমন এক সাংকেতিক ভাষা হিসেবে, যার প্রকৃত তাৎপর্য নাকি আধ্যাত্মিক। এই পাঠপদ্ধতির নিজস্ব গুরুত্ব থাকলেও এর একটি ফল হলো, গানগুলোর ভেতরে সক্রিয় থাকা অস্তিত্বগত জিজ্ঞাসাগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু বোধ করি, উকিল মুন্সীর গান এই অভ্যাসগত পাঠকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে। দেহ কেবল কোনো কিছুর প্রতীক নয়, কামনা কেবল কোনো গূঢ় সত্যের সাংকেতিক বহিঃপ্রকাশ নয় আর বিচ্ছেদও নয় শুধু আবেগের ঘটনা; বরং এগুলো এমন সব অভিজ্ঞতামূলক ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক অবস্থা, যার মুখোমুখি হয়ে মানুষ নিজের স্থির পরিচয়, আত্মবোধ এবং জগতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়। উকিল মুন্সী এই অভ্যস্ত পাঠপদ্ধতির গুদামে সরাসরি আগুন লাগিয়ে দেন। তার গান শুনলে একটা গভীর বাস্তব অস্বস্তি তৈরি হয়। তিনি দেহকে স্রেফ কোনো গূঢ় সত্যের বাক্স হিসেবে দেখেন না, কামনাকেও কোনো সাইন-ল্যাঙ্গুয়েজ বানান না। মুন্সী সাহেবের কাছে এগুলো একেবারে হাড়গোড় কাঁপানো ‘এক্সপ্যারিয়েনশিয়াল’ ও ‘অস্তিত্বতাত্ত্বিক’ বাস্তব। তার গানের রাজনীতিটা এখানেই যে তিনি কোনো অর্থের নিশ্চয়তা বা রেডিমেড উত্তর উৎপাদন করেন না; বরং আমরা যে সমস্ত শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে ‘নিশ্চিত’ হতে চাই, সেগুলোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান। ফলে গান শেষ হওয়ার পরও শ্রোতা কোনো উত্তরের অধিকারী হন না কিংবা যদিও বা হন, তার চেয়েও বেশি নিজের অনির্দিষ্টতাকে নতুনভাবে অনুভব করতে শুরু করেন।

মুন্সী সাহেবের কয়েকটা লাইন ধরে যদি আমরা পড়ি :

আমি খাড়া নদীর পাড়ে রে 
আমি ঘুরি নদীর পাড়ে রে
আমি কেমনে যাই সেই পাড়ে
নদীর পাড়ে বাঘের গাড়া
আমি দেইখা হইলাম আত্মহারা রে 
সঙ্গে সাথি ছিল যারা সবই গেল দূরে রে।
বেলা হলো অবসান 
কোন সময় জানি ছোটে তুফান রে 
ক্রমে ক্রমে ঘিরিল আঁধারে রে। 
আশা নদীর পাড়ে বইয়া
উকিল রইলাম পন্থ চাইয়া 
মথুরার বিকি যায় ফুরাইয়া রে।

লিপ-সার্ভিস দেওয়া সমালোচকরা একে ভব-নদী পারাপারের আকুতি বলে খালাস করে দেবেন। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এখানে সংকটটি কোনো ঘাট, নৌকা বা পথ না চেনার নয়। সংকট স্বয়ং এই ‘আমি’র। ‘আমি কেমনে যাই’ প্রশ্নটি পথের নয়, বরং সেই সত্তার, যে পথ চিনতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়। বক্তা কেবল নদীর এক তীরে আটকে নেই; সে এমন এক অবস্থায় আছে, যেখানে তার জ্ঞান, ইচ্ছা এবং আত্মপরিচয়ের স্থিতি একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে সংকটটি নৌকা বা পারাপারের নয়; বরং নিজের সঙ্গেই মানুষের সম্পর্কের।

ইউরোপীয় রেনেসাঁস বা আমাদের আধুনিক ‘মানুষগিরি’ মানুষের জন্য এমন এক কল্পিতকেন্দ্র নির্মাণ করেছে, যেখানে মানুষ নিজেকে মহাবিশ্বের সার্বভৌম অবস্থান হিসেবে ভাবতে শুরু করে। সে যৌক্তিক, সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে প্রকৃতিকে শাসন করে নিজের পথনির্ধারণ করে। কিন্তু উকিল মুন্সীর এই ‘আমি’টি ঠিক তার বিপরীত। সে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তার সমস্ত র‌্যাশনাল জ্ঞান, ইচ্ছা আর আত্মপরিচয়ের ক্যাটাগরিগুলো ধসে পড়ছে। সে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে।

এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয়, ‘নদীর পাড়ে বাঘের গাড়া’—তখন দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। এই বাঘ স্রেফ ভয়ের কোনো রূপক নয়; এ হলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এক আদিম, অমানবিক জগতের স্মারক। নদী, ঝড়, অন্ধকার আর বাঘ মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষ আর অধীশ্বর বা এজেন্টের ভূমিকায় থাকে না। মানুষ নিয়ে যে ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক প্রজেক্ট আধুনিকতা আমাদের গিলিয়েছে, এই চিত্র তাকে এক ধাক্কায় বাতিল করে দেয়। মানুষ এখানে জগৎ শাসনকারী কেউ নয়, বরং বহু অমানবিক শক্তি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে খাবি খাওয়া এক অতি ক্ষুদ্র উপাদান মাত্র। আধুনিকতার মগজে আছে প্রকৃতিকে অবজেক্ট বানিয়ে আয়ত্ত করার বাসনা আর উকিল মুন্সীর মানুষ বারবার আবিষ্কার করে, সে নিজেই প্রকৃতির এই বিপুল নেটওয়ার্কের ভেতরে হারিয়ে গেছে। অস্তিত্ব এখানে মাস্টারির নয়, বরং চরম অরক্ষিততার।

এই হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার কামতত্ত্বে নতুন মাত্রা লাভ করে :

কাম নদীতে হুঁশে বাইও তরি
ধার চিনিয়া সাঁতার দিলে
ঘটবে না বিপদ ভারী।
যখন নদীর জোয়ার ওঠে
ঢেউ গিয়া আকাশে ওঠে
কত নদ-নদী জলে ভাসে
ডুবায় কত ঘরবাড়ি।
একটি নদীর তিনটি সুতা
আছে তিন গাঙের মাথা
তিন সুতাতে হরফ তিনটা
আলিফ লাম মিম যোগ করি।
বিরহী উকিলের ইচ্ছামতে
কাম নদীতে বাইতে বাইতে গা
দেহেতে ধইরাছে রোগে
ঠিক নাই কোন দিন যাই মরি।

‘কাম নদীতে হুঁশে বাইও তরি’—এই পঙ্‌ক্তি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক কামনা-দর্শন ধারণ করে। কামনা কোনো পাপ নয়, আবার কোনো মুক্তির শর্টকাটও নয়। পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব ভারি অদ্ভুতভাবে আমাদের জানিয়েছে, কামনা মানেই এক ধরনের ‘অভাব’—যা ফ্রয়েড বা লাকাঁর সাইকোঅ্যানালিসিসে দমিত মনস্তাত্ত্বিক তাড়না হিসেবে হাজির হয়। উকিল মুন্সীর প্রস্তাবনা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তার কাছে কামনা কোনো অভাবের ভাষা নয়; তারচেয়ে দেহ, স্মৃতি, প্রকৃতি ও সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটা ‘রিলেশনাল’ এবং পরিবেশগত শক্তি। কামনায় যেমন কোনো পাপের আস্তানা বা ট্যাবু থাকে না, আবার মোক্ষলাভের কোনো রোমান্টিক শর্টকাট মইও নয় কামনা। কামনা একটি নদী। নদীকে যেমন সেঁচে মেরে ফেলা যায় না, তেমনি মানুষের ভেতরের লিবিডো বা কামনাকেও জোর করে দমন করা যায় না। নদীর ধর্ম বহমানতা, কামনার ধর্মও তা-ই। পশ্চিমা দমন-ভিত্তিক ম্যোরালিটির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি বলছেন, নদীকে অস্বীকার না করে যেমন তার বুকে কায়দা করে নাও ভাসাতে হয়, কামনার ভেতরেও মানুষকে তেমনি ‘হুঁশ’ বা সচেতনতা নিয়ে সাঁতরাতে হয়। এখানে এথিক্সের প্রশ্নটা নৈতিকতার নয়, সচেতনতার।

‘যখন নদীর জোয়ার ওঠে/ ঢেউ গিয়া আকাশে ওঠে’—তখন কামনা আর স্রেফ কোনো ব্যক্তির সাবজেক্টিভ অনুভূতির সীমানায় আটকে থাকে না। জোয়ার যেমন নদীর কৃত্রিম সীমানা ভেঙে দেয়, কামনাও তেমনি মানুষের চামড়ার অহংকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বাউন্ডারি চূর্ণ করে তাকে নিজের বাইরে নিয়ে যায়। আধুনিক সাইকোলজি যেখানে কামনাকে খোঁজে মানুষের ভেতরের ‘অবচেতনে’, উকিল মুন্সী তাকে খুঁজে পান মানুষ ও জগতের মধ্যবর্তী সম্পর্কের খোলা হাওয়ায়।

‘একটি নদীর তিনটি সুতা/ আছে তিন গাঙের মাথা’ কিংবা রহস্যময় ‘আলিফ লাম মিম’, বোঝা যায়, কামনা আসলে এক অব্যাখ্যাত ক্ষেত্র। এই জ্ঞান তো মাথায় থাকে না, থাকে মগজের বাইরে—দেহে, কামনায়, সাধনায় আর অভিজ্ঞতায়। আধুনিক কার্তেসীয় দর্শন যেখানে জ্ঞানকে স্রেফ মস্তিষ্কের সম্পত্তি বানিয়েছে, উকিল মুন্সীর গান তাকে খারিজ করে একটা ‘বিউপনিবেশী আর্কাইভ’ হিসেবে হাজির হয়। তিনি ইউরোপের অনেক আগেই আমাদের নিজস্ব এক জটিল অবয়ব-দর্শনের হদিস দেন, যা ইউরোকেন্দ্রিক থিওরির সর্বজনীনতার দাবিকে একদম অসাড় করে দেয়। এই জায়গায় উকিল মুন্সী আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বকেও প্রশ্ন করেন।

দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রার শেষে সাধক কোনো অলৌকিক ক্ষমতা পেয়ে পরমানন্দে ভাসেন না, বা কোনো ট্রান্সেন্ডেন্টাল বিজয়ী বীরের মতো খাড়া হন না। গানের একদম শেষ মাথায় এসে উকিল মুন্সী যে স্বীকারোক্তি দেন, তা আমাদের সমস্ত রোমান্টিক ও ‘আধ্যাত্মিক’ অহংকারকে মাটিতে মিশিয়ে দেয় :

‘দেহেতে ধইরাছে রোগে
ঠিক নাই কোন দিন যাই মরি।’

এই এক লাইনে লুকিয়ে আছে তার সমগ্র দেহতত্ত্বের আসল পলিটিকস। যে শরীরের এত দেমাক, যে কামনার এত জোয়ার—তা আসলে চরম ভঙ্গুর, নশ্বর এবং রোগাক্রান্ত। জ্ঞান মানুষকে মৃত্যুর ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না, বরং জ্ঞান মানুষকে তার অমোঘ মৃত্যুর মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

উকিল মুন্সীর নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে চেহারার বর্ণনা শুনে পোর্ট্রেট করেছেন শিল্পী এ জেড শিমুল

উকিল মুন্সীর দেহতত্ত্ব কোনো ‘মুক্তির তত্ত্ব’ বা স্যালভেশন থিওরি নয়। মানুষের দেহটা কোনো নিরেট, স্বয়ংসম্পূর্ণ গোলক নয়; এটা একটা ফুটো হওয়া ছাঁকনি, যার ওপর দিয়ে রোগ আসে, কামনা থিতু হয় আর সবশেষে মৃত্যু এসে কড়া নাড়ে।

কিন্তু এই ক্ষয়ে যাওয়া বা অরক্ষিততা তার আসল শক্তি। দেহটা যদি এতখানি ওপেন বা ফুটো না হতো, সে যদি চারপাশের অমানবিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হতে না পারত—তবে সে তো প্রেম অনুভব করতে পারত না! সে তো কামনার এমন মহাজাগতিক জোয়ারে কাঁপতে পারত না! বিচ্ছেদের এই অপরিসীম চাপ সে সইত কেমন করে?

মানুষ স্রেফ একটা স্রোতসংগম যেখানে নদী, কামনা, স্মৃতি, রোগ আর মৃত্যুর অজস্র ধারা এসে একে অপরের গায়ে আছড়ে পড়ছে। মানুষ কোনো কেন্দ্র নয়; মানুষ নিজেই একটা বহমান স্রোত। এই কারণে উকিল মুন্সীর দেহতত্ত্বকে মুক্তির তত্ত্ব বলার চেয়ে সীমাবদ্ধতার তত্ত্ব বলা বেশি যথার্থ। দেহ সর্বদা ভঙ্গুর। কামনা সর্বদা বিপজ্জনক। স্মৃতি সর্বদা অনুপস্থিতিকে বহন করে। জ্ঞান সর্বদা অসম্পূর্ণ। উকিল মুন্সীর গানকে কেবল মরমি সংগীত হিসেবেই নয়, বরং মানবতাবাদের বিকল্প এক অস্তিত্বতত্ত্ব হিসেবে পাঠ করা সম্ভব। সেখানে মানুষ কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নয়।

মানুষগুলো চলে গেছে, কিন্তু তাদের না-থাকা এখনো দেহের ওপর কাজ করছে। অনুপস্থিতিরও একটি কার্যকারিতা আছে। স্মৃতি শরীরে রয়ে যাওয়া একটি চাপ। এই চাপই বিচ্ছেদের প্রভাব। উকিল মুন্সীর বিচ্ছেদী গানগুলোর শক্তিও এখানেই : অনুপস্থিত মানুষকে বর্ণনা না করে তিনি অনুপস্থিতির প্রভাবকে বর্ণনা করেন।

হারিয়ে যাওয়া মানুষটার নাকের নোলক বা মুখের আদল হয়তো একসময় মগজ থেকে মুছে যায়, কিন্তু তার ‘না-থাকা’র যে তীব্র কম্পন, তা শরীরের ভেতরের কোনো এক গোপন অলিন্দে ঠিকই থিতু হয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের পুরনো চিঠি পুড়িয়ে ফেলবার জন্যে যে তালিম নিজেদের আমরা দেই, পুড়িয়ে ফেলার পর আমরা সেই তালিমের যাত্রাটার দিকে যেভাবে ফিরে তাকাই, একটা ‘মায়া’র চোখে, যেই মায়া কামনা, বাসনা কিংবা লিপ্সা বহির্ভূত নয়।

মুন্সী সাহেবের আরেকটা গান দিয়ে শেষ করি :

তুমি বিশ্বাস ভক্তি নিয়া দেখো চেষ্টা করিয়া
মানুষনি একটু হইতে পারো
মরণের আগে তুমি একবার মরো।
আগে শুদ্ধ করো মন
ভজো গুরুর চরণ
তোমার মতো ধন অর্পণ করো,
তোমার মনপ্রাণ দিয়া
পুঁটলি বানাইয়া
বিনামূল্যেনি সে ধন বিকাইতে পারো।
যদি পায়ে দেয় ঠেলিয়া
যাও তুমি পড়িয়া
দিও না ছাড়িয়া জড়াইয়া ধরো,
তুমি করো মালির কর্ম
হবে প্রেমের জন্ম
দেখো প্রেমের ফুলনি ফুটাইতে পারো।

‘মরণের আগে মরা’র এই যে তাগিদ, একে আমরা স্রেফ একটা মরমি ক্লিশে বা রূপক ভেবে পাশ কাটিয়ে যাই। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি আসলে আধুনিকতাবাদের সেই অহংকারী ‘সাবজেক্ট’ বা ‘মানুষগিরি’র এক চরম বিনাশের প্রস্তাবনা। মানুষ এখানে ‘মানুষ’ হয়ে উঠছে তখনই, যখন সে তার সার্বভৌম পরিচয়কে নিজ হাতে বিসর্জন দিচ্ছে। এই পৃথিবী হয়তো পৃথিবীর বাইরেও, কোনো অনুভূতি, কোনো কিছুই সার্বভৌম নয়।

এর পরের লাইনেই উকিল মুন্সী এক অদ্ভুত বাণিজ্যের হদিস দিচ্ছেন :

‘তোমার মনপ্রাণ দিয়া
পুঁটলি বানাইয়া
বিনামূল্যেনি সে ধন বিকাইতে পারো।’

পুঁজিবাদের এই জমানায়, যেখানে সবকিছুই এক একটা কমোডিটি বা পণ্য, যেখানে প্রতিটি সম্পর্কের পেছনে থাকে লাভ-ক্ষতির একটা ‘রেশনাল চয়েস’—সেখানে নিজের মন-প্রাণকে স্রেফ একটা পুঁটলি বানিয়ে ‘বিনামূল্যে’ বিলিয়ে দেওয়ার এই যে বাসনা এখানে কোনো প্রাপ্তির হিসাব নেই। সাধক নিজেকে কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন না; বরং তিনি নিজেকে এমন এক উপহারে পরিণত করছেন, যার কোনো বাজারমূল্য নেই।

মানুষের অহংকারকে গুঁড়া করে, তাকে বাজারের হিসাব-নিকাশের বাইরে এনে, এই মহাবিশ্বের অজস্র শক্তির মাঝে একজন অতি সাধারণ ‘সেবক’ বা মালি হিসেবে পুনঃস্থাপন করার এক তীব্র ইশতেহার উকিল মুন্সী রেখে গেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত