ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মার্কেট বঙ্গবাজার; শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই এটি একনামে পরিচিত। আগুনের বিভীষিকা একদিনেই নিঃস্ব করে দেয় এ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আগুনে পুড়ে যায় এ মার্কেটের প্রায় ৩ হাজার দোকান, মালামাল ও নগদ পুঁজি। সে সময় সব হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয় ব্যবসায়ীরা। তাদের দুর্দশা দেখে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এমনকি ভিক্ষুক বা তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মানুষরাও টাকা নিয়ে এ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ান।
আগুনের সেই ক্ষত তিন বছর পরও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে চলে গেছে গ্রামে। আবার কেউ জীবনসংগ্রামে ঘুরে দাঁড়াতে লড়াই করে যাচ্ছে এখনো। এখন পুড়ে যাওয়া মার্কেটের জায়গায় উঠছে বহুতল ভবন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্মাণ করছে আধুনিক বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স। ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জন ব্যবসায়ীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দোকান। ধারদেনা করে দোকানের কিস্তির টাকাও দেওয়া শুরু করেছে ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগ উঠেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার এ কিস্তির সঙ্গে নীরবে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। তৃতীয় কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার জন্য সবাইকে বাড়তি ১০ হাজার করে টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। গত কিস্তির তুলনায় এ কিস্তিতে প্রায় ৭ গুণ বেশি চাঁদা দিতে হচ্ছে। দ্বিতীয় কিস্তির সময় ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিয়েছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। জানা গেছে, চাঁদার অর্থের একাংশ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছাচ্ছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
যে ব্যবসায়ীদের পুড়ে যাওয়া দোকান দেখে ভিক্ষুক-হিজড়াদের মায়া হয়েছিল সেই ব্যবসায়ীদের পকেট কাটছেন মালিক সমিতির নেতারা ও সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে চাঁদার বাড়তি টাকা দিয়েই দোকানের সালামি (কিস্তি) পরিশোধ করছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, গত ৫ মে ডিএসসিসি থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদককে একটি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জন সদস্যকে তৃতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি পরিশোধের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে জারা দ্বিতীয় কিস্তি দেয়নি তাদের ৬ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। সে অনুযায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সালামির টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগীকে সঙ্গে নিয়ে সমিতির অফিসে যান এ প্রতিবেদক। বঙ্গবাজারের সপ্তম তলার সমিতির অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, পে-অর্ডারের সিøপ জমা দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। চারটি টেবিলে এসব সিøপ গ্রহণের কাজ করছে সমিতির নিয়োগ করা ব্যক্তিরা।
বঙ্গ ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাসেল দোকানিদের পে-অর্ডারের সিøপ গ্রহণ করে রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। এরপর আরেকটি বই বের করে ১০ হাজার টাকার একটি রশিদ ধরিয়ে দেন। পরিচয় গোপন রেখে রাসেলের কাছে এ ১০ হাজার টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মুচকি হেসে তিনি বলেন, ‘এটা সবাই জানে। নতুন করে বলার কিছু নেই।’ এ টাকা বেতন-ভাতা ও অফিস খরচ বাবদ ব্যয় করা হবে বলে রশিদের নিচে উল্লেখ আছে।
একইভাবে গুলিস্তান, মহানগর ও আদর্শ ইউনিটের টেবিলেও পে-অর্ডারের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা করে। এ ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। যারা মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে তাদের সমিতির খরচের দোহাই দেওয়া হয়। কেউ ‘সিস্টেম’ মেনে, কেউবা বাধ্য হয়ে দিচ্ছে চাঁদার এ বাড়তি টাকা।
পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারের চারটি ইউনিটে নতুন শপিং কমপ্লেক্স করার উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসসিসি। মার্কেটটিতে চারটি ইউনিট ছিল। বঙ্গবাজার হকার্স ইউনিটে ৮৬৩ জন, গুলিস্তান হকার্স ইউনিটে ৮২৮ জন, মহানগরী হকার্সে ৫৯৯ জন এবং আদর্শ হকার্স ইউনিটে ৬৭১ জন ব্যবসায়ীসহ মোট ২ হাজার ৯৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে দোকান বরাদ্দ পেয়েছে।
এ হিসাবে শুধু তৃতীয় কিস্তির সালামি আদায়ের নামে ১০ হাজার করে চাঁদা ওঠে মোট ২ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ টাকা সমিতির কোনো খাতে ব্যয় করা হবে, কারা নেবে সে প্রশ্ন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারা বলে, এ টাকা নিয়ে প্রশ্ন করলে দোকানের বরাদ্দই বাতিল হয়ে যেতে পারে। কারণ চাঁদার একাংশ যায় সিটি করপোরেশনে।
এর আগে আরও দুটি কিস্তি দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। প্রথম কিস্তির ১ লাখ টাকার সঙ্গে বাড়তি টাকা দিতে হয়নি। তবে দ্বিতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকার সঙ্গে সবাইকে দিতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। তৎকালীন কমিটির নেতারা হাতে লেখা স্লিপ দিয়ে এ টাকা নিয়েছে।
ওই টাকার একটি বড় অংশ গেছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের আটটি টেবিলে। বাকি ১৫ লাখ টাকা সমিতির নেতাদের হাতে ছিল। এরমধ্যে ৫ লাখ টাকা অফিস ভাড়া, অফিস খরচ ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয় করা হয়েছে এবং বাকি ১০ লাখ টাকা সমিতির ফান্ডে জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন সমিতির একাধিক নেতা।
ব্যবসায়ী ও সমিতির নেতারা এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন, খরচের জন্য ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার জন্য কিছু টাকা প্রয়োজন। তাই পে-অর্ডারের বাইরে কিছু টাকা নিতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিন্তু সে টাকার পরিমাণ ৩ কোটি বা কোটি টাকা হলে তা অস্বাভাবিক।
ভুক্তভোগী ও সমিতির সাবেক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অফিস ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং অফিস খরচ মিলিয়ে বছরে ১০ লাখ টাকার বেশি হবে না। কিন্তু তিন কোটি টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে তা কেউ জানে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘রীতি অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের জন্য দোকানপ্রতি ১ হাজার টাকা দিতে হয়। অফিস খরচের সঙ্গে সে অঙ্ক যোগ করলে ৪০ লাখ টাকা হয়। বাকি আড়াই কোটি কোথায় যায়?’
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম ও রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রবিবার দুপুরে তাদের কার্যালয়ে গিয়েও সাক্ষাৎ মিলেনি। তবে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের ভাষ্য, দোকান বরাদ্দপ্রাপ্ত যে কেউ পে-অর্ডার নিয়ে গেলে সিটি করপোরেশনের লোকজনই বাকি কাজ করে দেবে। এজন্য টাকা-পয়সার প্রয়োজন নেই।
অঞ্চল-১-এর কর-কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, ‘আমি এক সপ্তাহ হলো দায়িত্ব নিয়েছি। আমাদের কেউ এ কাজে জড়িত তাও শুনিনি। এখানে যে কেউ এলে আমরা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কিস্তির টাকা জমা করে দেব।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় কিস্তির সঙ্গে দেড় হাজার করে চাঁদা দিয়েছি। এটা কারও গায়ে লাগেনি। কিন্তু এবার চাচ্ছে ১০ হাজার করে! এরপর তো চাইবে ২০ বা ৩০ হাজার। এ টাকা কোথায় যাচ্ছে সে প্রশ্ন করার কেউ নেই।’
নিজেকে বিএনপির নেতা দাবি করে এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন, ‘কত মামলা-হামলার শিকার হলাম। জীবন বাজি রেখে ফ্যাসিস্ট তাড়ালাম। অথচ ফ্যাসিবাদের আমলে চাঁদা দিতাম ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। এখন নতুন কমিটি নিচ্ছে তার প্রায় ৭ গুণ। আমাদের লাভটা হলো কী?’
তিনি বলেন, ‘একবার মন চায় প্রতিবাদ করি। কিন্তু এটাও ভাবতে হয়, প্রতিবাদ করলে আমি নিজেই ঝামেলায় পড়ব। দোকানের বরাদ্দটাও বাতিল করে দিতে পারে। তখন কাউকে পাশে পাব না। তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দিয়েছি।’
আরেক জনের ভাষ্য, ‘তারা টাকা চায়, আমরা দেই। না দিলে নানা আইনের প্যাঁচে ফেলবে। চাঁদাবাজিটা মনে হয় এখানে সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সাধারণ সম্পাদক মীর আল মামুন এখন কানাডায়। বক্তব্য জানতে মার্কেটের সভাপতি আলহাজ¦ মো. মোজাম্মেল হককে গত শনি ও রবিবার একাধিকবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। রবিবার মার্কেটে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। নামপ্রকাশ না করে কমিটির একাধিক নেতা চাঁদার টাকা অফিস খরচ বাবদ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন।