'দাদীর আদুরে নাতী' থেকে বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের নায়ক

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০১:৩৩ এএম

তারকাখচিত স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটি তখন শেষ হয়েছে। মাঠজুড়ে রূপকথা গড়ার আনন্দ। অথচ এই রূপকথার মহানায়ক যিনি, সেই ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াসের গল্পটা আরও বেশি রোমাঞ্চকর। ফুটবল বিশ্ব যাকে আজ এক নামে চিনল 'ভোজিনহা’ নামে!

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটন ঘটিয়ে স্পেনের বিশ্ববিখ্যাত সব স্ট্রাইকারদের একাই রুখে দিয়েছেন এই বুড়ো চিলতে। ম্যাচ শেষে স্পটলাইটের পুরোটা কেড়ে নেওয়া এই গোলরক্ষকের জীবনকাহিনী, তার অদ্ভুত ডাকনাম এবং ব্রাজিলের সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা নিয়ে এখন তুমুল চর্চা চলছে।

১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের সময় জন্ম তার। বাবা ছিলেন কট্টর ফুটবলপ্রেমী মিলিটারী কর্মকর্তা। আর্জেন্টিনার ডিয়েগো ম্যারাডোনার সতীর্থ হোর্হে ভালদানো-র নামানুসারে ছেলের নাম রাখতে চেয়েছিলেন 'ভালদানো'। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন সেই বিদেশী নাম অনুমোদন দেয়নি।

পরবর্তীতে ব্রাজিলের ফুটবল এবং রাইট-ব্যাক 'জোসিমার'-এর পাঁড় ভক্ত বাবা ও দাদীর ইচ্ছায় ছেলের নাম রাখা হয় জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। নাম ব্রাজিলের তারকার মতো হলেও, শৈশবে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল একাডেমি বা দীক্ষা ছিল না। বড় হয়েছেন নানা-নানী ও দাদীর কাছে।

স্পেনের বিপক্ষে ৭টি সেভ করেছেন ভোজিনহা

শৈশবে পাড়ার বড় ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতেন জোসিমার। স্বভাবগতভাবেই হারতে পছন্দ করতেন না। মার খেয়েও মাঠ ছাড়তেন না, উল্টো প্রতিশোধ নিতেন। আর একটুতেই রাগ করে মুখ ভার করে বাড়ি ফিরে দাদী বা নানীর কাছে নালিশ করতেন। এই দেখে পাড়ার ছেলেরা তাকে খেপাত 'ভোজিনহা' বলে, পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ 'দাদীর আদুরে নাতি'। রেগে গিয়ে প্রথমে এই নাম অপছন্দ করলেও, পরবর্তীতে নানী-দাদীর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থেকে এই নামেই ফুটবল দুনিয়ায় নিজের ক্যারিয়ার গড়েন তিনি।

কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষকের সাথে ব্রাজিলের যোগাযোগ কেবল নামেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ব্রাজিলের সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ভক্ত। ব্রাজিলের বিখ্যাত পপ তারকা ইভেত সাঙ্গালো, সিদাদে নেগ্রা কিংবা সেউ হোর্হের গানের যেমন ভক্ত তিনি, তেমনি শৈশবে গিলেছেন ব্রাজিলের বিখ্যাত সব মেগা সিরিয়াল। তার এক ভাই তো বর্তমানে ব্রাজিলের রেসিফে শহরেই বসবাস করেন।

ফুটবলেও তার অনুপ্রেরণা ব্রাজিলের কিংবদন্তিরা। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে পেনাল্টি ও ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট ব্রাজিলের সাবেক গোলরক্ষক রজেরিও সেনি ছিলেন তার আদর্শ। এছাড়া রোনালদো নাজারিও (ফেনোমেনন) এবং রোনালদিনহোকে নিজের আইডল মানেন তিনি।

এক অসম্ভব লড়াইয়ের গল্প

পেশাদার ফুটবলের কোনো বেসিক বা একাডেমি ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা ভোজিনহা কেবল নিজের চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমে আজ এই পর্যায়ে এসেছেন। ২০১২ সালে ২৬ বছর বয়সে এঙ্গোলার লিগে প্রথম পেশাদার চুক্তি সই করেন। এরপর মলদোভা, সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া ঘুরে বর্তমানে খেলছেন পর্তুগালের সেকেন্ড ডিভিশনের ক্লাব শাভেস-এ।

২০১২ সাল থেকে দেশের জার্সি গায়ে লড়ছেন। চারবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস খেলার পর, এবার প্রথম বিশ্বকাপে পা রেখেই অধিনায়ক হিসেবে দেশকে এনে দিলেন ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট।

ভোজিনহা বলেন,

"বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার পর দেশের মানুষকে আনন্দের কান্না কাঁদতে দেখেছি। এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কেপ ভার্দের মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ আমরা তা সত্যি করলাম।"

৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে ব্রাজিলের যে জোসিমার বিশ্বকাপে জোড়া গোল করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে যেন ঠিক একইভাবে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিলেন কেপ ভার্দের এই 'জোসিমার' ওরফে ভোজিনহা!

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত