গত ২ জুন ২০২৬ বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এল নিনোর ব্যাপারে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রজল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে এল নিনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি যদি সত্যিই সৃষ্টি হয় তাহলে আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হয়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিবিসি মানচিত্র এঁকে সেই পরিস্থিতিতে পৃথিবীর কোন অঞ্চলে কী ধরনের অভিঘাত তৈরি হতে পারে সেটি ব্যাখ্যা করেছে (২ জুন ২০২৬)। এই মানচিত্র অনুযায়ী, এল নিনোর প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাংশে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে আর বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ ও দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অংশে শুষ্কতা দেখা দেবে।
‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা মোকাবিলা দিবস’ (১৭ জুন ২০২৬)-এর মাত্র কয়েকদিন আগে এ ধরনের সতর্ক বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই দিবসটির মূল বিষয়ই হলো মরুকরণ ও খরা এবং সতর্কবার্তাটি সরাসরি দিবসটির সঙ্গে সম্পর্কিত। কাজেই, এই সতর্কবার্তা দেশে দেশে মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৪ সালের ১৭ জুন, জাতিসংঘ প্যারিসে মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক একটি কনভেনশন (ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন টু কমব্যাট ডেজার্টিফিকেশন : ইউএনসিসিডি) দলিল তৈরি করে। কনভেনশন তৈরির এই দিনটিকে স্মরণে রাখার জন্য ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতি বছর ১৭ জুন বিশ্ব মরুকরণ ও খরা মোকাবিলা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৫ সাল থেকেই জাতিসংঘ তা পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৯৬ সালে কনভেনশনটি (ইউএনসিসিডি) কার্যকর করা হয়।
ইউএনসিসিডি অনুযায়ী মরুকরণ বলতে শুষ্ক, অর্ধ-শুষ্ক এবং কম আর্দ্রতাযুক্ত অঞ্চলে ভূমির অবক্ষয় বোঝায় যা জলবায়ুগত তারতম্য এবং মানবসৃষ্ট কর্মকা-সহ বিভিন্ন কারণের জন্য সংঘটিত হয়। আর খরা হলো এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা যা বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক নথিভুক্ত মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হলে সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে জলচক্রে গুরুতর ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় ও ভূমি সম্পদভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মরুকরণ এবং খরার আলোচনায় ভূমি অবক্ষয়ের বিষয়টি অবধারিতভাবে চলে আসে। ভূমি অবক্ষয় বলতে শুষ্ক, অর্ধ-শুষ্ক এবং কম আর্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টি ও সেচনির্ভর কৃষিজমি, অথবা চারণভূমি, বন ও বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমির জৈবিক বা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং জটিলতার হ্রাস বা ক্ষতিকে বোঝায়। মানুষের প্রকৃতি বিরোধী কর্মকান্ডের জন্যও ভূমির অবক্ষয় ঘটে।
এ বছর (২০২৬) ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা মোকাবিলা দিবস’-এর প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘রেঞ্জল্যান্ড : স্বীকৃতি দিন, সম্মান করুন, পুনরুদ্ধার করুন’। ‘রেঞ্জল্যান্ড’ শব্দটির বাংলা যথোপযোগী কোনো পরিভাষা নেই। আভিধানিকভাবে এটির বাংলা হয়তো ‘চারণাঞ্চল’ করা যেতে পারে, কিন্তু তার দ্বারা ‘রেঞ্জল্যান্ড’-এর প্রকৃত অর্থ ফুটে উঠে না। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে শুষ্কাঞ্চল, তৃণভূমি, ঝোপভূমি, সাভানা (বিক্ষিপ্ত বৃক্ষবিশিষ্ট উষ্ণম-লীয় তৃণভূমি), মরুভূমি, স্টেপ (বৃক্ষহীন শুষ্ক তৃণভূমি), পার্বত্য অঞ্চল, জলাভূমিসহ বিভিন্ন প্রকার বাস্তুতন্ত্রের এক বা একাধিক বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গড়ে উঠে ‘রেঞ্জল্যান্ড’। এ এমন বিস্তীর্ণ ভূমি যেখানে ঘাস, ঘাসসদৃশ উদ্ভিদ, ভেষজ সপুষ্পক উদ্ভিদ, ঝোপঝাড় এবং কখনো কখনো বৃক্ষের আচ্ছাদনযুক্ত এক বা একাধিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। এসব জায়গায় গবাদিপশু কিংবা তৃণভোজী প্রাণী চরতে পারে কিংবা নাও চরতে পারে।
মরুকরণ, খরা, ভূমি-অবক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রেঞ্জল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতপক্ষে, রেঞ্জল্যান্ড শুধু পশুচারণের ভূমি নয়; এটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, মরুকরণ মোকাবিলা এবং খরার প্রভাব হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউএনসিসিডির প্রধান লক্ষ্য হলো মরুকরণ মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা। এসব কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হলো ভূমি-অবক্ষয় মোকাবিলা ও ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধার এবং খরা-সহনশীলতা বৃদ্ধি। ফলে রেঞ্জল্যান্ড সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার একদিকে ভূমি-অবক্ষয় ও মরুকরণ হ্রাস করে অন্যদিকে খরার অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করে। তাই রেঞ্জল্যান্ড সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার করা গেলে তা মরুকরণ, ভূমি-অবক্ষয়, খরা, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
রেঞ্জল্যান্ড হলো মূলত উন্মুক্ত বা অকর্ষিত প্রাকৃতিক তৃণভূমি, ঝোপঝাড়, বনভূমি এবং সাভানা এলাকা যা গৃহপালিত গবাদিপশু এবং বন্যপ্রাণীদের চারণ বা ঘাস খাওয়ার উপযুক্ত স্থান। এটি সাধারণত চাষাবাদের জন্য অনুপযোগী হয় এবং এতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া ঘাস ও গুল্ম থাকে। পৃথিবীর স্থলভাগের অর্ধেকের বেশি অংশ রেঞ্জল্যান্ডের অন্তর্গত। এটি মাটির ক্ষয়রোধ, কার্বন সঞ্চয় এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। প্রশস্ত অর্থে চারণভূমির অন্তর্ভুক্ত হয় রেঞ্জল্যান্ড, পশুপালন ব্যবস্থা, এমনকি বন্য পশুর চারণ ও পাতা খাওয়ার জমিও। রেঞ্জল্যান্ডের চেয়ে সাধারণ চারণভূমি অধিক পরির্চযায় পরিচালিত হয়। এতে বীজ বপন, সেচ এবং সার প্রয়োগের মতো কৃষি র্কাযক্রম থাকে অপরদিকে রেঞ্জেল্যান্ডে মূলত প্রাকৃতকি উদ্ভদি জন্মে এবং ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে সীমিত যেমন নিয়ন্ত্রতি আগুন লাগিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় ঘাস পুনরায় জন্মানো। চারণভূমি ব্যবস্থাপনায় মাটির ধরন, ন্যূনতম বার্ষিক তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এবারের ‘বিশ্ব মরুকরণ ও খরা মোকাবিলা দিবস’-এর প্রতিপাদ্য রেঞ্জল্যান্ডের বৈশি^ক গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি স্থলভাগজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে রেঞ্জল্যান্ড। এই রেঞ্জল্যান্ড প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবিকা, খাদ্য ও পানি নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই প্রতিপাদ্যের মূল আহ্বান হলো রেঞ্জল্যান্ডের বহুমাত্রিক মূল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া, এগুলোর ঐতিহ্যগত অভিভাবক ও ব্যবহারকারীদের সম্মান করা এবং অবক্ষয়গ্রস্ত রেঞ্জল্যান্ডকে পুনরুদ্ধার করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা।
পৃথিবীর মোট ভূমির এক-পঞ্চমাংশ হচ্ছে মরুভূমি এবং এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে খরা আক্রান্ত ভূমি। খরা আক্রান্ত ভূমির মধ্যে এক দশমিক দুই শতাংশ হচ্ছে চরমভাবে খরা আক্রান্ত ভূমি। পৃথিবীর তিনশ বিশ কোটি মানুষের ওপর মরুকরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আর খরা সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যা একশ চুরাশি কোটি। মরুকরণের ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : দারিদ্র্য, দুর্বল স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তার অভাব, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, পানির সংকট, জোরপূর্বক অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা হ্রাস। মরুকরণের ফলে ভূমির উপরিভাগ শুকিয়ে যায় ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় ধূলিঝড়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
রেঞ্জল্যান্ড সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় কয়েকভাবে সহায়তা করতে পারে। রেঞ্জল্যান্ডে বিদ্যমান ঘাস, ঝোপঝাড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উদ্ভিদ মাটিকে আচ্ছাদিত রাখে; ফলে বায়ু ও পানির দ্বারা মাটিক্ষয় কমে এবং ভূমির উৎপাদনশীলতা বজায় থাকে। এতে ভূমি অবক্ষয় ধীর হয় এবং মরুকরণের ঝুঁকি হ্রাস পায়। একই সঙ্গে উদ্ভিদ আচ্ছাদন ও মাটির জৈব পদার্থ বৃষ্টির পানি শোষণ ও সংরক্ষণে সাহায্য করে, ফলে মাটিতে আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে এবং খরার সময়ও ভূমি তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল থাকে। সুস্থ রেঞ্জল্যান্ড পশুখাদ্যের স্থায়ী উৎস হিসেবে কাজ করে এবং খরাকালে পশুপালননির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষায় সহায়তা করে। রেঞ্জল্যান্ড পুনরুদ্ধার কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য হলো ভূমি অবক্ষয় মোকাবিলা ও ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধার এবং খরা-সহনশীলতা বৃদ্ধি। ফলে রেঞ্জল্যান্ড সংরক্ষণ একদিকে মরুকরণ প্রতিরোধ করে, অন্যদিকে খরার অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। রেঞ্জল্যান্ড সংরক্ষণের জন্য সাধারণত অবক্ষয়গ্রস্ত ভূমি পুনরুদ্ধার, উদ্ভিদ-তৃণভোজী প্রাণী ও উদ্ভিদ-অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্কের সঠিক ব্যবস্থাপনা, আদিবাসী ও স্থানীয় জ্ঞানের ব্যবহার এবং পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বিত প্রয়োগের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুস্থায়ী রেঞ্জল্যান্ড ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
বাংলাদেশে ‘রেঞ্জল্যান্ড’ শব্দটি সরকারি, বেসরকারি নথিপত্রে এবং গবেষণাপত্রে খুব একটা দেখা যায় না। ২০২৩ সালে বিখ্যাত এলসিভিয়ার গ্রুপের একটি জার্নালে বাংলাদেশের দুজন গবেষক (রানা ও মনিওজ্জামান) এক প্রবন্ধে পশুপালনকেন্দ্রিক রেঞ্জল্যান্ডের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রবন্ধে বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রেঞ্জল্যান্ড সম্পদ জলবায়ু পরিবর্তন, মানবসৃষ্ট কর্মকা- এবং রেঞ্জল্যান্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতির অভাবে ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। রেঞ্জল্যান্ড সম্পদ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করা অপরিহার্য এবং উপযুক্ত স্থান নির্ধারণকে রেঞ্জল্যান্ড ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে লেখকদ্বয় উল্লেখ করেছেন। উত্তরাঞ্চলের খরা মোকাবিলার জন্যও এটি প্রয়োজন। ওপরে বর্ণনাকৃত বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রেঞ্জল্যান্ডের সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যার আলোকে দেশের হাওর, চর, পাহাড়ি অঞ্চলসহ জলাভূমিগুলোকে অবশ্যই রেঞ্জল্যান্ড বলা যেতে পারে। কাজেই এগুলোকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, এগুলোর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে সম্মান করা এবং অবনমিত কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত রেঞ্জল্যান্ডগুলো পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন।
লেখক : প্রাণিবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ