আনারস বাগানে একদিন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বেজে ১০ মিনিট। লিলু ভাই এসে উপস্থিত যাব নতুন গন্তব্যের দিকে। কিছুদিন আগে লিলু ভাই সন্ধান দিয়েছিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামের এক আনারস বাগানের। আমরা চলছি  ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল গ্রামের দিকে। সিলেটে আনারস বলতেই বুঝানো হতো শ্রীমঙ্গল অথবা বিয়ানীবাজারের জলঢুপী। তবে, গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণের ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া চেয়ারম্যান’ আনারস বাগান বদলে দিয়েছে সেই ধারণা। সেই বাগানের সুবাদে গোলাপগঞ্জ এখন আনারসের দেশ। চান মিয়া চেয়ারম্যানের আনারস বাগান ঘিরে চলছে আনারস উৎসব। রসালো আনারসের গন্ধে ম ম করছে চারদিক। বাগান থেকে আনারস সংগ্রহ, বিক্রি এবং দর্শনার্থীদের ভিড়ে বাগান এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ এমনটাই বলছিলেন আমাদের পাইলট লিলু ভাই। 

আজ অবশ্য আকাশের মন ভালো নেই কিছু সময় পর পর বৃষ্টি পড়ছে। পিচ ঢালা পথ পেরিয়ে আমরা যাচ্ছি আনারস বাগানে। আনারস বাগানের বেশ খানিকটা দূরেই আমাদের গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হলো। সামনে আর এগিয়ে যাওয়া যাবে না। পথে দীর্ঘ যানজট দেখতে পেলাম সাবাই। আনারস বাগানে যাচ্ছে অনেক মানুষ। আমাদের মতো অনেকেই ঘুরতে যাচ্ছেন এই বাগানে। আমরা পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলছি। এরই মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাই দ্রুত পা বাড়ালাম। চারপাশে উঁচু-নিচু টিলা। বাতাসে ভেসে আসছে পাকা আনারসের ঘ্রাণ! ডানপাশে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড চোখে পড়ল লেখা ‘আব্দুল মতিন চান মিয়া আনারস বাগান।’ আমরা এসে উপস্থিত হলাম বাগানের প্রবেশ দ্বারে। গেট পেরিয়ে এগোতেই উঁচু-নিচু টিলার বুক চিরে সারি সারি সাজানো-গোছানো আনারস বাগান। থোকা থোকা গাঢ় সবুজের ডানা মেলেছে ছোট-বড় হাজারো কাঁচা-পাকা আনারস। পথিমধ্যে কথা হলো স্থানীয় অধিবাসী মুরাদ ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি বললেন, প্রায় ৬০ কেয়ার জায়গা নিয়ে পারিবারিকভাবে এ আনারস বাগানটি। ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের দু’বারের চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার সন্তানরা এর দেখভাল করেন। বৃহৎ আকারে গোলাপগঞ্জে এটিই একমাত্র আনারসের বাগান। জলঢুপী জাতের এ আনারসের বাগানটি দত্তরাইল গ্রামে গড়ে উঠে ২০১৯ সালে। শখের বসে গড়ে তোলা বাগানে এখন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার আনারসের চারা গজিয়েছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক ছাড়া প্রায় ১৮ মাস পরিচর্যা করে এখন শুরু হয়েছে বিক্রি। প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ হাজার পাকা আনারস বিক্রি হচ্ছে। তবে এ আনারস বিক্রি করে আয়ের সব টাকা জমা হচ্ছে মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার নামে গঠিত ‘আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া এডুকেশন ট্রাস্টে’। যে ট্রাস্ট শিক্ষাসহ এলাকার অসহায় মানুষের কল্যাণে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে যাচ্ছে।

যেদিকে চোখ যায় কেবল আনারস। কাঁচা, পাকা, আধাপাকা আনারস। আর এসব আনারস সংগ্রহ করছেন অসংখ্য শ্রমিক। সারি সারি আনারস গাছ আর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। এক টিলা থেকে অপর টিলার ঢাল বেয়ে আনারস গাছের সারিতে চোখ জুড়িয়ে যায়। তপ্ত রোদেও সেখানে আছেন শত শত দর্শনার্থী। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই আরেক দৃশ্য। সূর্যের তাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীর ভিড়। উঁচু-নিচু টিলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সড়কের উভয়পাশই যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা স্বপ্নের রাজ্য। মেঘলা আকাশ পুরো এলাকা আরও বেশি উপভোগ্য করে তোলে। অনেকক্ষণ বাগানে ঘোরার পর আমরা নেমে এলাম সমভূমিতে। দেখতে পেলাম আব্দুল মতিন চান মিয়ার বাড়ির সামনে বাগানের প্রবেশপথের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে জুস কর্নার ও বিশ্রামাগার। আর ওই জুস কর্নারে বাগানের আনারস কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। ১০ টাকা, ৫ টাকা বা যার যেমন চাহিদা কেটে রাখা আনারস খাচ্ছেন। আবার এখানে একটি ক্যাশ কাউন্টার রেখে আনারস বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই বাগান দেখে বাড়ি ফেরার সময় দর্শনার্থীরা পরিবার-পরিজনের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন আনারস। আকারভেদে রাখা হচ্ছে আনারসের দাম। সর্বনিম্ন ৮০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা পর্যন্ত হালিতে আনারস বিক্রি হচ্ছে দেখতে পেলাম। সিলেট জেলার ভেতরে খুব কাছাকাছি এমন দৃশ্য পাওয়া দুষ্কর। বাগান থেকে ছোট পাকা সড়ক ধরে এগিয়ে গেলে বিএনকে স্কুল পর্যন্ত সড়কের উভয়পাশে দেখা যায় নয়নাভিরাম দৃশ্য। গাড়ি থামিয়ে সড়কের পাশে বসেও প্রকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সেই সঙ্গে এলাকার মানুষের বন্ধুসুলভ আচরণও আপনাকে মুগ্ধ করবে।

যেভাবে যাবেন

সিলেটের কদমতলি থেকে গোলাপগঞ্জ সড়ক হয়ে ঢাকা দক্ষিণে যাওয়ার ১ কিলোমিটার আগে ডান পাশে ব্র্যাক অফিস। এর পাশ দিয়েই প্রবেশ করেছে বিএনকে সড়ক। সিলেট থেকে অটোরিকশায় করে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। আর বাসে গেলে লাগবে ৩০ টাকা। এখানে নেমে পায়ে হাঁটলে ১০ মিনিট, আর গাড়িতে করে গেলে ২ থেকে ৩ মিনিট। চাইলে সিলেট থেকে রিজার্ভ গাড়িও নিতে পারেন। পুরো দিনের জন্য অটোরিকশার ভাড়া সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা আর মাইক্রোবাস হলে সর্বোচ্চ ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা ভাড়া নিতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত