সময়ের আলোকিত ছয় মুখ

বোধের আলো ও মননশীলতার বাতিঘর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৩:২৮ এএম

আমাদের সমাজ ও মননের দীর্ঘ যাত্রাপথে এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাদের উপস্থিতি একটি গোটা প্রজন্মের চিন্তার জগৎকে নতুন করে নির্মাণ করে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তেমনই এক প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্ব। তার জীবনের মূল সাধনাই হলো অন্ধকার থেকে আলোর দিকে মানুষের উত্তরণ ঘটানো। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের বুকে নীরবে এক সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন এবং ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরির এই নিরলস যাত্রায় নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন।

এই যাত্রার শুরুটা হয়েছিল শেকড়ের গভীর থেকে। ১৯৩৯ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির বেড়ে ওঠা এবং শিক্ষার প্রতিটি স্তরেই ছিল এক অনুসন্ধিৎসু মনের উজ্জ্বল ছাপ। মাত্র তেইশ বছর বয়সে একটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন কিংবা পরে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা সবখানেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে উদারনৈতিক মুক্তচিন্তার প্রেরণা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তার মেধার বিচরণ ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। ষাটের দশকে বাংলাদেশের নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সে সময়কার নবীন সাহিত্যিকদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তিভূমি হয়ে উঠেছিল। এরপর সত্তর দশকে দূরদর্শনের পর্দায় তার মননশীল উপস্থাপনা সাধারণ মানুষের মনে তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ও মহত্তম স্বপ্ন হলো ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। ১৯৭৮ সালে সেগুনবাগিচার একচালা টিনের একটি ছোট ঘরে তিনি এই স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন। সমাজের চারপাশের অবক্ষয় এবং সম্ভাবনাহীনতার মধ্যে তিনি এমন এক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে মানুষ জ্ঞানের চর্চা ও মূল্যবোধের ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারে। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার দেশের আনাচে-কানাচে বই পৌঁছে দিয়ে পাঠাভ্যাসের এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তুলেছে।

আমাদের সমাজে অনেক সময় মানুষকে দেবতার আসনে বসানোর এবং পরে প্রত্যাশা না মিললে তীব্রভাবে অবমূল্যায়ন করার এক অদ্ভুত চক্র দেখা যায়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদও এই মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনের মুখোমুখি হয়েছেন। নিজস্ব মানবিক দুর্বলতা ও মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব নিয়েই তিনি একজন রক্তমাংসের মানুষ। তিনি আরামদায়ক মূলধারার বাইরে এসে চিন্তার প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে প্রচলিত বোধকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একটি অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে এমন বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাকে গঠনমূলক পর্যায়ে রাখা এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই একটি পরিপক্ব সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত। রামোন ম্যাগসেসে থেকে শুরু করে একুশে পদক বা বাংলা একাডেমি পুরস্কার নানা সম্মাননায় ভূষিত এই মানুষটি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার এক বিশাল দর্পণ। প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বৌদ্ধিক সততার মাধ্যমে একটি জাতির মননে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলার এক জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কালের সীমানা পেরিয়ে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন এবং আগামী প্রজন্মকেও মননশীলতার পথে হাঁটতে প্রেরণা জোগাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত