গুরুত্ব পাবে বাণিজ্য জ্বালানি কৃষি ও শ্রমবাজার

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:০৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে আগামী রবিবার বিদেশে যাচ্ছেন। শুরুতেই তিনি যাচ্ছেন মালয়েশিয়া। সেখান থেকে যাবেন চীন।

আগামী সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, বৃহস্পতিবার চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং পরদিন শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমান বৈঠক করবেন। তিন দেশের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কূটনৈতিক সূত্র এই বৈঠকগুলোর বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে গতকাল বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে।

এই সফরে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে প্রায় ১৫টি সমঝোতা স্মারক সই হবে। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৫টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।   

এর বাইরে বাংলাদেশ যেসব বিষয়ে সহযোগিতা চাইতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, বাংলাদেশে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনা নদীর ওপর আরেকটি সেতু, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণে বিনিয়োগ, কৃষিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে চীনের গুয়াংজু ও সাংহাইয়ের সরাসরি ফ্লাইট চালু ইত্যাদি।

প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি কর্মসূচিতে বক্তৃতা করবেন। বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনেরও প্রস্তুতি নিয়েছে। 

অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), মুদ্রা বিনিময় চুক্তি, ঢাকায় একটি চীনা ব্যাংক স্থাপন ও চীনা মুদ্রায় একটি বন্ড চালু করা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায়।

চীনের প্রেসিডেন্টের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই-গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ), বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (জিএসআই-গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ), বৈশ্বিক সভ্যতা উদ্যোগ (জিসিআই-গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ) ও বৈশ্বিক সুশাসন উদ্যোগে (জিজিআই-গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ) বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করতে চায় দেশটির সরকার।   

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ তাকে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, এমন বড় পরিবর্তনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী বিদেশে কোথায় যাবেন, কখন যাবেন, সে বিষয়ে মানুষের বেশ আগ্রহ আছে। তাকে (প্রধানমন্ত্রী) কোনো না কোনো দেশ দিয়ে শুরু করতে হবে। সেদিক থেকে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘ভালো শুরু’ বলা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ দেশ রূপান্তরকে গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক দরকার। সেদিক থেকে কে কী বলল, সেটা চিন্তা না করে নিজের গরজ অনুযায়ী এগোতে হবে।’

মুন্সী ফয়েজ বলেন, ‘চীনের সঙ্গে সহযোগিতার অনেক দিক আছে, সেগুলো এগিয়ে  নেওয়া জরুরি। সেগুলোতে গতি সঞ্চার করতে হবে।’        

দেশ দুটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি এরই মধ্যে প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে। চীন সফরের প্রাক্কালে ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সফরের প্রস্তুতি পর্যালোচনার জন্য পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গত ৯ জুন বেইজিং সফর করেন।

মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগামীকাল শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর আগামী রবিবার বিকেলে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে। তিনি আগামী সোমবার বেইজিংয়ের উদ্দেশে কুয়ালালামপুর ত্যাগ করবেন। চীন সফর শেষে তিনি আগামী শুক্রবার বিকেলে ঢাকার উদ্দেশে বেইজিং ত্যাগ করবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন। এর বাইরে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, একাধিক প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টা মালয়েশিয়া সফরে থাকছেন। আর চীন সফরে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, একাধিক প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একাধিক উপদেষ্টা সফরসঙ্গী হচ্ছেন। 

মালয়েশিয়া : কুয়ালালামপুরে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে দুই বছর ধরে স্থবির থাকা শ্রমবাজার কার্যকরভাবে আবার চালু করা ও অনথিভুক্ত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধ করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। দুই দিককার সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত অবস্থায় এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা অনুযায়ীদের কর্মীদের বিনাখরচে পাঠানো ও দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জট খোলার সূচনা প্রধানমন্ত্রীর সফরে হতে পারে, এমনটি আশা করছে সরকার। এর বাইরে, সংস্কৃতিসহ দুটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক সই হবে।

মালয়েশিয়ায় রপ্তানি বাড়ানো, দেশটি থেকে বিনিয়োগ পাওয়া, কৃষি-শিক্ষা-প্রযুক্তি খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া এবং কক্সবাজারে আশ্রিত মিয়ানমারের রাখাইনের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের সেখানে ফেরত পাঠাতে সরকার সহযোগিতা চাইবে।      

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত