বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের খেলা শেষ হতেই বিশ্ব ফুটবলের দৃশ্যপট দুই মেরুতে রূপ নিয়েছে। একদিকে লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো মহাতারকারা নিজেদের প্রথম ম্যাচেই গোলের জোয়ারে ভেসে স্বপ্নের মতো বিশ্বকাপ শুরু করেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির জাদুকরী হ্যাটট্রিক বিশ্বমঞ্চে তার গোলসংখ্যাকে নিয়ে গেছে ১৬-তে, যা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চেয়ে ঠিক দ্বিগুণ। অথচ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর এমন উড়ন্ত ফর্মের ঠিক পরের দিনই হতাশাজনক পারফর্ম করলেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি বয়সী (৪১ বছর) খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ফিফা র্যাংকিংয়ের ৪৬ নম্বর দল কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের ১-১ গোলের তিক্ত ড্রয়ের পর এখন ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নÑ পর্তুগাল কি তবে মাঠে একজন ফুটবলার নিয়ে খেলছে, নাকি কেবলই একটি অতীত ‘মূর্তি’ বহন করছে?
পর্তুগালের জার্সিতে ১৪৩টি গোল করা সর্বকালের সেরা এই গোলদাতার বিশ্বমঞ্চের পারফরম্যান্স গ্রাফ এখন অনেকটাই নিম্নমুখী। কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে তার ২৩তম ম্যাচ। কিন্তু আফ্রিকান দলটির বিপক্ষে মাঠের পুরো সময়জুড়ে থেকেও কোনো গোল পাননি তিনি, যা বিশ্বকাপে খেলা ২৩ ম্যাচের মধ্যে ১৭তম বারের মতো তাকে গোলহীন রাখল। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার এই গোলখরা এখন টানা ১০ ম্যাচ বা ৮০১ মিনিটে গিয়ে ঠেকল।
ফিফার অফিশিয়াল পারফরম্যান্স পরিসংখ্যানের হিসাব আরও নিষ্ঠুর। ফিফার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গো ম্যাচে রোনালদোর আক্রমণাত্মক প্রভাব ছিল পুরো মাঠের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন, যা কেবল তিনজন ডিফেন্ডারের চেয়ে সামান্য ভালো ছিল। কঙ্গোর তরুণ মিডফিল্ডার মুকাউ তো ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে সরাসরিই বলে দিলেনÑ ‘সত্যি বলতে, তাকে মার্ক করার জন্য আমাদের বাড়তি কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কারণ আমরা জানি সে আর আগের মতো নেই, তার বয়স হয়েছে। ৪১ বছর বয়সে আপনি আর আগের মতো একই শ্রম মাঠে দিতে পারবেন না’।
ব্রিটেনের ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ পত্রিকার খ্যাতনামা ফুটবল বিশ্লেষক রিচার্ড জলির মতে, ‘রোনালদোর ইগোকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পর্তুগাল আরও একটি বিশ্বকাপ বিসর্জন দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে’। মাঠে ৮০ শতাংশ সময় বল দখলে রেখেও পর্তুগালের প্রত্যাশিত গোল হার ছিল মাত্র ০.৬৯। গতি আর ড্রিবলিংয়ের ক্ষমতা হারিয়ে রোনালদো এখন কেবল বক্সের ভেতর অনড় দাঁড়িয়ে থাকছেন, যা দলের আক্রমণভাগের স্বাভাবিক গতিকে পুরোপুরি অচল করে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মাঠের ভেতর তার অতি আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে। ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার অরিঁ ম্যাচের একটি সুনির্দিষ্ট মুভমেন্টের উদাহরণ টেনে তীব্র সমালোচনা করেছেন। অঁরির মতে, ম্যাচের একপর্যায়ে ব্রুনো ফার্নান্দেজ যখন বল নিয়ে বক্সে ঢুকছিলেন, তখন রোনালদোর উচিত ছিল ডিফেন্ডারকে টেনে অন্য পাশে রান নেওয়া, যাতে ব্রুনো ফাঁকা জায়গায় বল ট্যাপ-ইন করতে পারেন। কিন্তু নিজে গোল করার তীব্র তাড়নায় রোনালদো উল্টো ব্রুনোর ব্যাক-পাসের লাইনে চলে আসেন এবং বলের গতিপথ আটকে দিয়ে ডিফেন্ডারদের কাজ সহজ করে দেন। এই ঘটনায় ব্রুনো ফার্নান্দেজকে মাঠের মধ্যেই প্রকাশ্যে হাত ছুড়ে চরম ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
ইউরো ২০২৪-এর মতোই কোচ রবার্তো মার্তিনেসের কৌশল নিয়ে ফুটবল মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে। ম্যাচের পারফরম্যান্সের বিচারে বার্নার্দো সিলভা কিংবা পেদ্রো নেতোর মতো তরুণ তারকাদের তুলে নেওয়া হলেও অফ-ফর্মে থাকা ৪১ বছরের রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখে এক ধরনের অন্ধ ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে। সাবেক ফুটবলারদের মতে, মার্তিনেস আসলে এই দলের ম্যানেজার নন, তিনি রোনালদোর নামের ওপর সিদ্ধান্ত চাপাতে ভয় পাচ্ছেন। বিবিসির আলোচনায় সাবেক ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি বলেন, ‘রোনালদোর মতো অতি মানবিক চরিত্রের উপস্থিতি তরুণদের সহজাত খেলা কেড়ে নেয়, দল বাধ্য হয়ে কেবল উইং থেকে একঘেয়ে ক্রস করতে থাকে’।
মার্তিনেস অবশ্য বরবরের মতোই রোনালদোকে ডিফেন্ড করেছেন, ‘আমরা ক্রিশ্চিয়ানোকে বয়স দিয়ে বিচার করি না। যখন দলের গোলের প্রয়োজন, তখন পৃথিবীর অন্যতম সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’ একই সঙ্গে ২০২২-এ প্রথম ম্যাচে হেরেও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতার উদাহরণ টেনে তিনি ভক্তদের ধৈর্য ধরতে বলেন।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর রোনালদোর আচরণ তার ভেতরের হতাশা ও একাকীত্বকে আড়াল করতে পারেনি। রোনালদো দলের বাকি সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে না থেকে একা একাই গ্যালারির অভিবাদনের তোয়াক্কা না করে টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে যান। ম্যাচ শেষেও দলের একমাত্র নেতা হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে এসে ভক্তদের আশ্বস্ত করে লিখেছেন, ‘আমরা যেমনটা চেয়েছিলাম তেমন শুরু হয়নি, তবে লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মাথা উঁচু রাখো এবং পরের ম্যাচে ফোকাস করো’।
সৌদি প্রো-লিগের গোলের বন্যা যে বিশ্বকাপের মতো এলিট মঞ্চে কোনো কাজে আসে না, তা কঙ্গো ম্যাচেই প্রমাণিত। পর্তুগাল বর্তমানে গ্রুপ ‘কে’-তে ৩ নম্বরে অবস্থান করছে। আগামী মঙ্গলবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে কোচ রবার্তো মার্তিনেস কি কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সোনালি প্রজন্মকে মুক্ত করবেন, নাকি রোনালদোর ছায়ায় বন্দি থেকেই শেষ হবে সিআর সেভেনের শেষ বিশ্বকাপ? উত্তর দেবে সময়।