ব্রাজিলের প্রয়োজন বাস্তববাদী ফুটবল

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:০২ এএম

বিশ্বকাপের মঞ্চে পা দিলেই ব্রাজিলের ২০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের প্রত্যাশার পারদ আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। সেলেসাওদের সবসময়ই আসরের অন্যতম ‘ফেভারিট’ বা শীর্ষ দাবিদার ভাবা হয়। কিন্তু একজন সাবেক ফুটবলার এবং বাস্তবতার নিরিখে যদি আজ আমি দলটিকে মূল্যায়ন করি, তবে বলবÑ ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল কোনোভাবেই ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামেনি।

হ্যাঁ, আমাদের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে, যা আমাদের সবসময়ই ট্রফির অন্যতম সম্ভাব্য প্রতিযোগী হিসেবে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু বর্তমান দলটির মাঠের খেলা এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে এটিকে কোনোভাবেই টুর্নামেন্টের সেরা দল বলা চলে না। ৫২ বছর পর কঙ্গোর মতো দলের কাছে যখন পয়েন্ট হারাতে হয়, তখন আত্মবিশ্বাসে চির ধরাটাই স্বাভাবিক।

কার্লো আনচেলত্তির আগমন ব্রাজিলের এই ধারাবাহিকতাহীনতা দূর করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মিলানে খেলার সুবাদে এই ইতালিয়ান কোচের অধীনে আমার চার মৌসুম কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব খুব ভালো বোঝেন এবং ফুটবলারদের সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরি করতে পারেন। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে গিয়ে তার ট্রফি জেতার রহস্য এটাই।

যেহেতু তিনি ইতালিয়ান, তার মজ্জায় রয়েছে রক্ষণাত্মক ফুটবল কৌশল। তিনি গোল হজম করতে একদম পছন্দ করেন না; ১-০ ব্যবধানে ম্যাচ জেতাও তার দর্শনে দারুণ এক শিল্প। তবে এখনই দল নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা কঠিন, কারণ ব্রাজিলের ডাগআউটে তিনি একদম নতুন। তিনি সাধারণত কোনো পূর্বপরিকল্পিত ছকে ফুটবলারদের বন্দি করেন না, বরং খেলোয়াড়দের নিজস্ব শক্তির ওপর ভিত্তি করে খেলার মডেল তৈরি করেন। ব্রাজিলের বর্তমান দলটিতে আক্রমণাত্মক ধারার ফুটবলার তেমন একটা নেই, তাই আনচেলত্তির এই বাস্তববাদী এবং রক্ষণাত্মক কৌশলের ওপরই আমাদের বেশি নির্ভর করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল দল তার ঐতিহ্যবাহী ‘জোগো বোনিতো’ বা নান্দনিক ফুটবলের ছন্দ হারিয়েছে। এর অন্যতম বড় কারণÑ আমাদের তরুণ ফুটবলাররা খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। এর ফলে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের যে সহজাত ব্যক্তিগত স্কিল এবং একক নৈপুণ্যের জোর ছিল, তা আজ হারিয়ে গেছে। আমরা শৈশবের একাডেমি পর্যায় থেকেই ব্রাজিলিয়ান ঘরানা বাদ দিয়ে ইউরোপীয় ঘরানার টেকনিক্যাল ও ট্যাকটিক্যাল স্টাইল জোর করে ঢুকিয়ে দিচ্ছি।

অতীতে ব্রাজিল দলে সবসময় এমন একঝাঁক মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ড থাকতেন, যারা একাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারতেন। আজ আনচেলত্তির পুরো স্কোয়াডের দিকে তাকিয়ে দেখুন, একমাত্র নেইমার ছাড়া সেই অতিমানবীয় সৃজনশীলতা আর কারও মধ্যে নেই। এখন কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসছে ঠিকই, তবে তারা মূলত উইঙ্গার বা প্রান্তীয় ফরোয়ার্ড। লিগে কিংবা জাতীয় দলে আগের মতো গোলমেশিন বা খাঁটি ‘সেন্টার-ফরোয়ার্ড’ তৈরির যে যুব কাঠামো ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

অনেকেই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো কিংবা নেইমারের তুলনা করতে চান। ভিনির ড্রিবলিং করার প্রবণতা আমাদের ঐতিহ্যবাহী ব্রাজিলিয়ান ঘরানার কথা মনে করিয়ে দেয় ঠিকই, তবে তাকে এখনই রোনালদো বা নেইমারের সমকক্ষ ভাবা মারাত্মক ভুল হবে। সে রিয়াল মাদ্রিদের অন্যতম সেরা অস্ত্র হতে পেরেছে, কিন্তু ব্রাজিলের জার্সিতে ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দেওয়ার মতো স্তরে পৌঁছাতে হলে তাকে জাতীয় দলের হয়ে আরও অনেক পরিপক্বতা অর্জন করতে হবে।

দীর্ঘদিন নিয়মিত ফুটবলের বাইরে থাকা সত্ত্বেও নেইমারের অনস্বীকার্য মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তবে প্রায় দুই মাসব্যাপী এই বিশ্বকাপের সংক্ষিপ্ত সময়ে তাকে শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট এবং মানসিকভাবে ভীষণ ফোকাসড থাকতে হবে। তাকে বুঝতে হবে যে তিনি একটি সামগ্রিক দলের অংশ।

নেইমারকে এই দলে একজন ‘পজিটিভ লিডার’ বা ইতিবাচক নেতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে, কোনোভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ছড়ানো যাবে না। গত বিশ্বকাপের একটি উদাহরণ দেওয়া যাকÑ প্রথমার্ধে রিচার্লিসন নিজেই বল নিয়ে একটি শট নেওয়ায় নেইমার তার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এর খেসারত হিসেবে দেখা গেল, দ্বিতীয়ার্ধে রিচার্লিসন বল পেলেই নিজে শট না নিয়ে মাঠের সেরা সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বারবার কেবল নেইমারকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।

এই ধরনের মানসিকতা দলের জন্য ক্ষতিকর। মাঠে সতীর্থদের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা হবেই, তবে তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর এমন মানসিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে না, যাতে তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। নেইমার যদি ইতিবাচকভাবে দলকে নেতৃত্ব দেন, তবেই তরুণরা তাদের সেরাটা দিতে পারবে। আর এই পুরো মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য বজায় রাখার মূল দায়িত্বটি কিন্তু পালন করতে হবে কোচ কার্লো আনচেলত্তিকেই।

লেখক : ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী

দলের ডিফেন্ডার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত