যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননের মাঝে কোনঠাসা ইসরায়েল

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক নিয়ে নিজের বিরোধী অবস্থান প্রকাশ্যে খুব একটা প্রকাশ করেননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলের মনোভাব এবং লেবাননে দেশটির সামরিক পদক্ষেপের দিকে তাকালে চিত্রটি স্পষ্ট ইসরায়েল ক্ষুব্ধ এবং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বরাবরই কৌশলী। তিনি জানেন, ট্রাম্প মাঝে মাঝে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করলেও, ইসরায়েলকে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ছাড় দিয়ে থাকেন, এমনকি যখন পুরো বিশ্ব ইসরায়েলকে কোণঠাসা করে রেখেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এর বড় উদাহরণ; বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতির পর নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলায় রাজি করাতে পেরেছিলেন।

কিন্তু সেই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি। ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ট্রাম্পের এই চুক্তিতে সম্মত হওয়ার সিদ্ধান্ত, ইসরায়েলের তথাকথিত ‘বিশেষ সম্পর্কের’ ভিত্তি নড়িয়ে দিয়েছে এবং দুই মিত্রের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য স্পষ্ট করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির আওতায় ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা এবং তাদের ‘মিত্ররা’ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ‘অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে’ বন্ধ করবে।

এই চুক্তির পরপরই ইসরায়েল লেবাননে ভয়াবহ হামলা শুরু করে। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারের (১৯ জুন) হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। একই রাতে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনাও নিহত হন। এর জের ধরে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘পুরো লেবানন জ্বালিয়ে দিতে হবে।’

তবে শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতির খবর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় ওয়াশিংটনের চাপের মুখেই এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ইসরায়েল।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ইসরায়েল এখন কতদূর এই বিরোধিতা চালিয়ে যেতে পারবে এবং নিজের দেশের ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জনগণকে সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত এক টিভি জরিপে দেখা গেছে, খুব কম সংখ্যক ইসরায়েলি মনে করেন যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। ডালিয়া শেইনডিন নামক এক ইসরায়েলি বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলিদের হতাশা অত্যন্ত গভীর। নেতানিয়াহুর দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। তারা মনে করছেন, যুদ্ধটি অকালে শেষ হয়েছে এবং বড় কোনো ভুল হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার সমালোচকদের উদ্দেশে কথা বলেন। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার জন্য বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।’

এরপর মন্ত্রিসভার সদস্য বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিখের দিকে ইঙ্গিত করে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলি মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পৃথিবীর একমাত্র শক্তিশালী মিত্রের ওপর এভাবে হামলা চালাতাম না।’

চ্যাথাম হাউসের ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্টকে এর আগে কখনোই ইসরায়েলের সমালোচনা করতে বা এমন ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেতানিয়াহু বোঝেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছেদ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিরোধিতার একটি নাটকীয় চিত্র তৈরি করা প্রয়োজন।’

ইসরায়েলি পার্লামেন্ট সদস্য ওফার কাসিফ মনে করেন, নেতানিয়াহুর পুরো সরকার কেবল একটি উদ্দেশ্যেই কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু ও তার সহযোগীদের মূল লক্ষ্য হলো চুক্তিটিকে বাধাগ্রস্ত ও ধ্বংস করা। তারা নিরাপত্তা ও সুরক্ষার গল্প শুনিয়ে মূলত ধ্বংসযজ্ঞ চালাতেই বেশি আগ্রহী।’

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় অংশজুড়ে ছিল ইরান ভীতি এবং হিজবুল্লাহর মতো শক্তির জুজু দেখানো। কিন্তু বর্তমানে সেই কৌশল ইসরায়েলকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ‘ধ্বংসই’ এখন তাদের একমাত্র দৃশ্যমান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত