রেকর্ড ভাঙা-গড়ার মহোৎসবে ২০২৬ বিশ্বকাপ

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায় বিশ্বকাপের এবারের আসরের কেটেছে কেবল ১০ দিন। কিন্তু এর মধ্যেই ইতিহাসের পাতাগুলো ওলটপালট হতে শুরু করেছে। মাঠের তুমুল লড়াই, গ্যালারির উন্মাদনা আর বুলেটের গতিতে ছুটে চলা বলের সাথে তাল মিলিয়ে যেন এক নতুন ফুটবলীয় বিপ্লব রচিত হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চের এই ৪৮ দলের মহাসমরে পরাশক্তিদের প্রথম ম্যাচের রেশ কাটতে না কাটতেই একঝাঁক মহাজাগতিক রেকর্ড হয় ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, নয়তো নতুন কোনো চূড়ায় ওঠার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। প্রথম ম্যাচের রোমাঞ্চ পায়ে মেখে মহাতারকারা যখন দ্বিতীয় রাউন্ডের লড়াইয়ে নামার ছক কষছেন, তখন ডাগআউট থেকে মাঠের স্কোরবোর্ড সবখানেই নতুন ইতিহাসের হাতছানি।

চলুন চোখ রাখা যাক বিশ্বমঞ্চের সেই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান আর নতুন কীর্তিগাথা লেখার অপেক্ষায় থাকা মহাতারকাদের রোমাঞ্চকর খতিয়ানে 

ক্লোসাকে ছোঁয়ার পর একক রাজত্বের অপেক্ষায় লিওনেল মেসি

২০১৪ সাল থেকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের রেকর্ডটি এককভাবে নিজের দখলে রেখেছিলেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। তবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয়ে জাদুকরী হ্যাটট্রিক করে সেই চূড়ায় বসেছেন লিওনেল মেসি। ক্লোসাকে স্পর্শ করতে মেসির লেগেছে ২৭ ম্যাচ। আজ সোমবার রাতে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ 'জে'-র ম্যাচে নামছে আলবিসেলেস্তেরা। আর মাত্র একটি গোল করলেই ক্লোসেকে ছাড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের একক ‘বিশ্বকাপ গোলরাজ’ হয়ে যাবেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই জাদুকর।

রোনালদোর ‘ছয়’ ও বয়সের নতুন ইতিহাস

একদিকে মেসি যখন রেকর্ড ছুঁয়েছেন, অন্য দিকে চিরপ্রতিদ্বন্দী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর বিরুদ্ধে ফ্লপ খেললেও অনন্য এক ইতিহাস গড়ে ফেলেছেন। মাঠে নামার সাথে সাথেই ৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড (গোলরক্ষক বাদে) খেলোয়াড় হিসেবে শুরুর একাদশে খেলার রেকর্ড গড়েন সিআরসেভেন। এছাড়া মেসি যেমন রোনালদোর ৫টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড স্পর্শ করেছেন, তেমনি এই বিশ্বকাপে রোনালদো একটি গোল করতে পারলেই ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়বেন।

ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা এমবাপ্পে

মেসির ঠিক পেছনেই ১৪ গোল নিয়ে ওত পেতে আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। প্রথম ম্যাচেই ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার (৫৮ গোল) আসনটি নিজের করে নিয়েছেন এই ফরাসি অধিনায়ক। কাতার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ী এমবাপ্পের সামনে এবার সুযোগ রয়েছে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুটি গোল্ডেন বুট জেতার। যদিও লড়াইয়ে তাঁর সাথে আছেন হ্যারি কেইন ও আর্লিং হালান্ডরা।

ভোজিনহার রূপকথা ও অনন্য কীর্তি

পরাশক্তি স্পেনের আক্রমণভাগকে একাই রুখে দিয়ে কেপ ভার্দের ৪০ বছর ১২ দিন বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা এখন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক। অভিষেক বিশ্বকাপে ক্লিনশিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলরক্ষকের রেকর্ড এখন তাঁর দখলে। একই সাথে কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার কীর্তিও গড়েছেন এই ‘নীল হাঙর’।

নরওয়ের ইতিহাস এক ম্যাচেই ওলটপালট করেন হালান্ড

বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করা যেখানে যেকোনো স্ট্রাইকারের আজীবনের স্বপ্ন, সেখানে নরওয়ের হয়ে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই জোড়া গোল করেছেন আর্লিং হালান্ড। ইরাকের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে মাত্র ২০ বার বল ছুঁয়েই নরওয়ের ইতিহাসের যৌথ সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা (শেতিল রেকদালের সাথে) হয়ে গেছেন এই গোলমেশিন। মঙ্গলবার সেনেগালের বিপক্ষে নামলেই রেকদালকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে তার সামনে।

লিনেকারকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় কেইন

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে গ্যারি লিনেকারের ১০ গোলের রেকর্ড ছুঁয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন। ঘানার বিপক্ষে পরের ম্যাচেই তিনি লিনেকারকে ছাড়িয়ে একচ্ছত্রভাবে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা হতে পারেন। 

হেলমুট শনের রেকর্ডের দুয়ারে দিদিয়ের দেশম

কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৬টি ম্যাচ জেতার রেকর্ডটি এককভাবে দখলে রেখেছেন পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি কোচ হেলমুট শন। ফ্রান্সের বর্তমান বস দিদিয়ের দেশম আর মাত্র একটি জয় পেলেই ছুঁয়ে ফেলবেন তাঁকে। ইরাকের বিপক্ষে ফরাসীরা জিতলেই দেশম এই রেকর্ডের ভাগীদার হবেন এবং গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নরওয়েকে হারাতে পারলে ১৭ জয় নিয়ে রেকর্ডের চূড়ায় বসবেন তিনি।

লাল কার্ডের বাজারে উত্তাপ

২০০৬ সালের বিশ্বকাপে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২৮টি লাল কার্ড দেখা গিয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপের মাত্র ১০ দিনেই রেফারির পকেট থেকে বের হয়ে গেছে ৮টি লাল কার্ড। মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচেই ৩টি লাল কার্ডের পাশাপাশি কাতার, বসনিয়াসহ অন্যান্য ম্যাচের ফুটবলাররাও এরই মধ্যে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন। গত দুটি বিশ্বকাপের (রাশিয়া ও কাতার) মোট লাল কার্ডের সংখ্যাকেও (৪টি) অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে এবারের টুর্নামেন্ট। ম্যাচের সংখ্যা বিবেচনায় এই রেকর্ডটি ভেঙে চুরমার হওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত