আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এক পুঁচকে দ্বীপরাষ্ট্র। বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে যাদের অস্তিত্বই ছিল খাপছাড়া। সেই নাম না জানা কেপ ভার্দে এখন বিশ্বকে দেখাচ্ছে রূপকথার নতুন সংজ্ঞা! প্রথম ম্যাচে পরাশক্তি স্পেনকে গোলশূন্য রুখে দিয়ে যারা হইচই ফেলে দিয়েছিল। অনেকেই তো তকমা দিয়ে ফেলেছিল অঘটনের। তবে কেপ ভার্দে যেন এখন আর কোনো অঘটনের নাম নয়। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের রুখে দেওয়ার পর এবার লাতিন আমেরিকার ফুটবলকেও চমকে দিল তারা। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে ২-২ গোলে স্তব্ধ করে দিল এই নবাগতরা। কাগজে-কলমে ৫১ ধাপ এগিয়ে থাকা মার্সেলো বিয়েলসার দলকে রুখে দিয়ে মায়ামি স্টেডিয়ামে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল এক লড়াকু ফুটবল বিপ্লব, কেপ ভার্দে। বুকভরা সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকলে ফুটবল মাঠে কোনো দলই ছোট নয় তা প্রমাণ ক্ররে দেখাল তারা।
নাম না জানা এই দেশটিকে ফুটবল দুনিয়া এখন চেনে ‘ব্লু শার্কস’ বা নীল হাঙর নামে। মায়ামির মাঠে গতকাল রবিবারের ম্যাচের নিজের নামের যথার্থতারই যেন প্রমাণ ছিল তারা। ম্যাচের বয়স যখন ২১ মিনিট, তখন প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে নেওয়া কেভিন পিনার এক অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক উরুগুয়ের জাল কাঁপিয়ে দেয়। কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোল! যদিও সাবেক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে প্রথমার্ধের শেষ দিকে মাক্সি আরাউজো ও অগাস্টিন ক্যানোবিওর জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে লিড নিয়ে ম্যাচে ফেরে। কিন্তু কেপ ভার্দের ছেলেরা দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। ম্যাচের ৬১ মিনিটে উরুগুয়ে ডিফেন্সের এক মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে, চিতার গতিতে বল কেড়ে নিয়ে ফাঁকা জালে বল জড়িয়ে দেন বদলি নামা হেলিও ভার্দে। ২-২ সমতায় ফেরার পর মায়ামির গ্যালারি-জুড়ে যে আবেগের ঢেউ উঠেছিল, তা ছুঁয়ে গেছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে।
এই ম্যাচের পরতে পরতে যেন জড়িয়ে ছিল দারুণ সব আবেগঘন গল্প। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম দুই দলের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন ৪০ ঊর্ধ্ব দুই গোলরক্ষক! উরুগুয়ের মুসলেরা যখন নিজের ১৮তম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলছেন, ঠিক তখন বিপরীত শিবিরে কেপ ভার্দের গোলপোস্ট আগলে রেখেছিলেন ৪০ বছর বয়সী মহাতারকা ভোজিনহা। স্পেনের বিরুদ্ধে অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর রাতারাতি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হওয়া ভোজিনহার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার মাত্র ৫০ হাজার থেকে লাফিয়ে পৌঁছে গেছে ১৫ মিলিয়নে! যেই সংখ্যা দেশটির জনগণের প্রায় ৩০ গুণ!
তবে ভোজিনহার জন্য আজকের রাতটি ছিল আরও বেশি আবেগের। ভিসা জটিলতার কারণে প্রথম ম্যাচে মাঠে থাকতে না পারা ভোজিনহার মা আনা কান্দিদা এভরা এদিন ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের বিশেষ সহযোগিতায় মায়ামির গ্যালারিতে বসে ছেলের এই অবিস্মরণীয় লড়াইয়ের সাক্ষী হন। ম্যাচ শেষে গ্যালারি থেকে ছেলের উদ্দেশ্যে মায়ের সেই দেশের পতাকা ওড়ানো আর মাঠ থেকে ছেলের স্যালুট দেওয়ার দৃশ্যটি ছিল মায়ামির রাতের সবচেয়ে সুন্দর ছবি।
দুই ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে কেপ ভার্দে এখন দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক সমীকরণের সামনে। ‘এইচ’ গ্রুপে তারা এখন টেবিলের তিনে। আগামী ২৬ জুন গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব। এই ম্যাচে একটি জয় তাদের নিয়ে যাবে শেষ ৩২-এর মঞ্চে। আর সমীকরণের অঙ্কে কেপ ভার্দে যদি রানার্স-আপ হয়ে নকআউটে পৌঁছায়, তবে শেষ ৩২-এর মঞ্চেই তাদের দেখা হয়ে যেতে পারে ‘জে’ গ্রুপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন তথা লিওনেল মেসির ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সঙ্গে!
মাঠের পারফরম্যান্স ছাড়িয়ে কেপ ভার্দে এখন তাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস দিয়ে মন জয় করছে পুরো বিশ্বের। মায়ামির গ্যালারিতে ম্যাচ শেষে উরুগুয়ের খেলোয়াড়রা যখন মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন নীল হাঙররা নাচ আর গানে উদযাপন করছিলেন বিশ্বজয়ের আনন্দ। যেই আনন্দে সামনের কোনো সমীকরণ নেই কোনো দুশ্চিন্তা, নেই কোনো ভয়। যেন বিশ্বটাই জয় করে ফেলেছেন তারা।
৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে সেরা তৃতীয় স্থানাধিকারী দলগুলোরও পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। উরুগুয়ের সঙ্গে ড্রয়ের পর ২ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে আছে কেপ ভার্দে। সমান পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে এগিয়ে উরুগুয়ে আছে দ্বিতীয় স্থানে এবং ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে স্পেন। ১ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানিতে সৌদি আরব।
আগামী ম্যাচগুলোর দিকে তাকিয়ে কোচ বুবিস্তা বলেন, ‘বিশ্বমানের দুটি দলের বিরুদ্ধে আমরা যা করেছি, তাতে আমাদের এখন নকআউট পর্বে যাওয়ার লক্ষ্য রাখাটাই যৌক্তিক। তবে আমরা জানি, এই গ্রুপের যেকোনো দলেরই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
গ্রুপের শেষ রাউন্ডে স্পেন যদি উরুগুয়েকে হারায় এবং সর্বশক্তির সৌদিকে কেপ ভার্দে হারায়, এমনকি ড্রও করে, তবে গ্রুপ রানার্স আপ হয়ে নকআউটে যাবে কেপ ভার্দে। তেমনটা হলে গ্রুপ জে’র চ্যাম্পিয়ন (যদি হয়) আর্জেন্টিনার সঙ্গে খেলা পড়বে তাদের।
তবে স্পেনের পর উরুগুয়ের মতো দলের সঙ্গে ড্র করলেও খেলোয়াড়দের মাটিতে পা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বুবিস্তা। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শেষ গ্রুপ ম্যাচ নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘তাদের মাটিতে পা রাখতে হবে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ম্যাচটিও কঠিন হবে, কারণ তাদেরও পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমরা অবশ্যই জেতার জন্য খেলব।’