গত আগস্টে আলাস্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্মেলনের পর যে ‘সমঝোতা’ হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলেছে রাশিয়া। মস্কোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এই অভিযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে যে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত তিন দিনে রাশিয়ার তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উল্লেখ না করেই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বৃদ্ধি এবং সম্প্রতি ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে মস্কোর এই হতাশা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ট্রাম্প গত বছর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি জেলেনস্কির কঠোর সমালোচনাও করেছেন। ক্রেমলিন ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে আসছিল। বিশ্লেষকদের মতে, আলাস্কা সম্মেলনের পর থেকে রাশিয়া ‘অ্যাঙ্কোরেজ স্পিরিট’ বা ‘আলাস্কার চেতনা’র কথা বলে আসছিল, যা মূলত ইউক্রেনকে দোনবাস অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুদ্ধবিরতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতো। তবে সম্মেলনের মাত্র এক মাস পরেই ট্রাম্পের অবস্থানে পরিবর্তন আসে এবং তিনি ইউক্রেন হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখল করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন, যা মস্কোকে চরমভাবে হতাশ করে।
সর্বশেষ প্রতিক্রিয়ায় ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ রোববার বলেছেন, সমঝোতার ক্ষেত্রে কেবল একটি পক্ষ (রাশিয়া) প্রতিশ্রুতি মেনে চলেছে, অন্য পক্ষ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মন্তব্য করেছেন যে, আলাস্কা সম্মেলন সম্ভবত কিয়েভ সরকারকে পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘কৌশলগত সময়ক্ষেপণ’ ছিল। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মৌলিক সমঝোতা থেকে সরে আসার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন এখন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো রাশিয়ার কট্টর বিরোধী নীতি গ্রহণ করছে।
বিশ্লেষক গেরহার্ড ম্যাঙ্গট মনে করেন, ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান হামলার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি ও সামরিক খাত সংকটের মুখে পড়ায় মস্কো নার্ভাস হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার জনগণকে আশ্বস্ত করতে পুতিনকে এখন দৃশ্যমান কিছু করতে হবে। এতে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।’
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ওলেগ ইগনাভ জানান, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান-ইসরায়েল ইস্যুতে ট্রাম্পের মনোযোগ সরে যাওয়ায় রাশিয়া হতাশ। মস্কো এখন চায় ওয়াশিংটন পুনরায় সক্রিয় হোক, যাতে রাশিয়া নিজেদের শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে পারে। তবে বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বা টেবিলে কোনো চুক্তি না থাকায় ক্রেমলিন ক্ষুব্ধ।
রিয়াবকভ জানিয়েছেন, এসব সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংলাপ অব্যাহত রাখবে রাশিয়া। তবে এই অভিযোগের মাধ্যমে ট্রাম্পের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের যে বরফ গলার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা এখন ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।
সূত্র: রয়টার্স