সুপার কম্পিউটারের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বসেরা এখন চীন

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

জার্মানির হামবুর্গে প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ৫০০ সুপার কম্পিউটারের সর্বশেষ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে চীন। দেশটির শেনঝেনভিত্তিক ন্যাশনাল সুপার কম্পিউটিং সেন্টারের তৈরি ‘লাইনশাইন’ এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বমঞ্চে চীনের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা ও প্রভাব আবারও প্রমাণিত হলো।

প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ২.১৯৮ এক্সাফ্লপস গতির এই সুপার কম্পিউটারটি প্রতি সেকেন্ডে ২০০ কোটিরও বেশি (২ কুইন্টিলিয়ন) গণনা সম্পন্ন করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের ‘এল ক্যাপিতান’ সুপার কম্পিউটারকে ২০ শতাংশ ব্যবধানে পেছনে ফেলে তালিকার শীর্ষে উঠে এল লাইনশাইন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের পর থেকে এটিই প্রথমবার, যখন কোনো চীনা সিস্টেম এই তালিকার শীর্ষস্থান দখল করল। এর আগে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অবস্থিত এল ক্যাপিতান তালিকার শীর্ষে ছিল।

বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সুপার কম্পিউটারের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং সুইজারল্যান্ডের তৈরি সিস্টেমগুলোও জায়গা করে নিয়েছে। তবে তালিকার তিন, চার ও পাঁচ নম্বরে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টিয়ার, অরোরা এবং জার্মানির জুপিটার সুপার কম্পিউটার অবস্থান করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখেও চীনের এই সাফল্য প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির কম্পিউটার বিজ্ঞানের এমেরিটাস অধ্যাপক জ্যাক ডনগারা বলেন, চীনের ওপর উন্নত চিপ রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র বিধিনিষেধ আরোপ করলেও, লাইনশাইনের সাফল্য প্রমাণ করে যে চীন নিজস্ব বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহারে কতটা দক্ষ। ডনগারার মতে, রফতানি নিয়ন্ত্রণ হয়তো কিছু ক্ষেত্রে চীনকে বাধাগ্রস্ত করছে, কিন্তু একইসঙ্গে তা দেশটিকে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে। হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সমন্বিত নকশায় চীন যে বড় ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছে, লাইনশাইন তারই প্রমাণ।

লাইনশাইনের একটি বিশেষ দিক হলো, এটি সম্পূর্ণভাবে সাধারণ সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ) দিয়ে তৈরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল চালানোর জন্য সাধারণত গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) প্রয়োজন হয়, যা বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল। অথচ সিপিইউ-নির্ভর ডিজাইন ব্যবহার করেও ২ এক্সাফ্লপসের সীমা অতিক্রম করা সিস্টেম হিসেবে লাইনশাইন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এদিকে, সুপার কম্পিউটারের এই তালিকায় চীনের প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। ২০১৯ সালে তালিকার প্রায় অর্ধেক স্থান চীনের দখলে থাকলেও, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত কয়েক বছরে চীন তালিকার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছিল। ইন্টারসেক্ট ৩৬০ রিসার্চের সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডিসন স্নেল বলেন, চীন আবারও এই তালিকায় ফিরে আসা এবং শীর্ষস্থান দখল করাটা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের জন্য একটি সংকেত। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এগিয়ে থাকলেও এই ব্যবধান দ্রুত কমে আসছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থানের ফলে সুপার কম্পিউটিংয়ের সংজ্ঞায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের এআই ইনডেক্স রিপোর্ট অনুযায়ী, এআই মডেলের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ব্যবধান প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যদিও মাইক্রোসফট, গুগল বা অ্যামাজনের মতো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এআই গবেষণায় এগিয়ে আছে, তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য সুপার কম্পিউটারের গুরুত্ব এখনো অপরিসীম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব অর্জনের লড়াইয়ে প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। তবে শুধুমাত্র এআই-এর আধিপত্য দিয়ে বিজ্ঞানের আধিপত্যকে বিচার করা উচিত নয়। প্রযুক্তির সুষম উন্নয়নে সরকারগুলোকে একদিকে যেমন সাধারণ বিজ্ঞান গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিজ্ঞানের সাথে সমন্বয় করার নীতিও গ্রহণ করতে হবে। লাইনশাইনের এই সাফল্য মূলত সেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতারই এক নতুন অধ্যায়।

সূত্র: আল-জাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত