ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প

মানবিক সংকট, প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

বুধবার (২৪ জুন) দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলা। দেশটির এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্প এমন সময়ে আঘাত হেনেছে, যখন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। 

বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সরকারি দুর্নীতি এবং তেল খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি বছরের পর বছর ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ৮০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। 

চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কিছু উদারীকরণ পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে তিনি বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের উদ্যোগ নেন।

যদিও ওয়াশিংটন কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে এবং তেল উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে, তবুও উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন মজুরির কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির প্রায় ৮০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি, ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট রয়েছে। ফলে গাড়িতে জ্বালানি নেওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ ওষুধ কেনাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই ভূমিকম্পজনিত মানবিক সংকট দেশটির নাজুক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষীণ আশাকে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। একই সঙ্গে হাজারো প্রাণহানি ও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে। বছরের পর বছর বিনিয়োগের অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এমন সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়।

এ পর্যন্ত অন্তত ৩২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৭০০ জন। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি থেকে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। সর্বোচ্চ ক্ষতির এই অঙ্কটি ভেনেজুয়েলার পুরো অর্থনীতির আকারের কাছাকাছি।

ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ভূকম্পবিদ ড. লুসি জোন্স বলেন, ভূমিকম্পের তীব্র কম্পনে গ্যাস পাইপলাইন ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ডের মতো দ্বিতীয় পর্যায়ের বিপর্যয়ও ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অগ্নিকাণ্ড বড় ভূমিকম্পে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।

অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি তেল শিল্প এখনও পুনরুদ্ধারের জন্য বিপুল বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উৎপাদনের যে স্বর্ণযুগ ছিল, তার কাছাকাছি যেতে হলেও এই খাতে কয়েকশ কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত