হাতি-মেঘের ছাতা বৃত্তান্ত

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম

মেঘগুলো আজ দুপুর থেকে আষাঢ়ের আকাশের গায়ে আলকাতরা মাখিয়ে দিচ্ছিল। ফলাফল হিসেবে একটু পরে শুরু হলো সেই বিখ্যাত ঝুমঝুম বৃষ্টি। থামার কোনো লক্ষণ নেই। গ্রামের চ-ীম-পের দাওয়ায় তখন বসা ছিলেন ফণীবাবু, পঞ্চানন খুড়ো আর পরাণহরির ছেলে জীবনহরি। এমন বৃষ্টি যে, বাইরে এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। ফণীবাবু তামাকটা নিজ হাতে সাজালেন। তারপর কল্কেতে আয়েশ করে একটা টান দিয়ে বললেন, ‘এই যে বৃষ্টি দেখছিস জীবন, এ তো কেবল জল নয়। এ হলো মেঘেদের কান্না।’

জীবনহরি চোখ গোল গোল করে বলল, ‘মেঘ আবার কাঁদে নাকি জ্যাঠামশাই?’

ফণীবাবু  গোঁফের ফাঁকে মুচকি হেসে বললেন, ‘কাঁদবে না? আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগের আষাঢ় মাসের এক দিনের কথা। এখনো আমার মনে আছে, তারিখটা ছিল সাতই আষাঢ়, বুধবার।  এমন বৃষ্টি নেমেছিল, নদী-নালা, খাল-বিল সব এক হয়ে গেল। আমার তখন তরুণ বয়স। পিঠে একটা ছাতা বেঁধে নাটোর থেকে হেঁটে ফিরছি। হঠাৎ দেখি, একটা প্রকা- আষাঢ়ের মেঘ আকাশ থেকে ধপাস করে এসে পড়ল আমাদের চলন বিলে।’

পঞ্চানন খুড়ো ঝিমোচ্ছিলেন। তিনি ফোড়ন কাটলেন, ‘মেঘ বিলে পড়ল মানে? সে তো বাষ্প!’

ফণীবাবু হাত নেড়ে বললেন, ‘ধুর মশাই, সাধারণ মেঘ হলে তো কথাই ছিল না! সেটা ছিল এক মস্ত বড় হাতি-মেঘ। আকাশ চরে বেড়াতে বেড়াতে পা ফসকে নিচে পড়ে ডানা ভেঙে ফেলেছিল। বেচারা যন্ত্রণায় এমন চিৎকার শুরু করল যে, চারপাশের গাছপালা সব উপুড় হয়ে পড়ল। জানেন তো আমি দয়ার সাগর। মেঘটার ছটফটানি দেখে সইতে পারলাম না। পিঠের ছাতাটা খুলে তার ভাঙা ডানায় বেঁধে দিলাম ব্যান্ডেজের মতো করে। আশ্চর্যের বিষয়, ছাতাটা মেঘের শরীরে ছোঁয়া মাত্র সেটি চামড়ার মতো জুড়ে গেল। আমি ঝোলা থেকে এক সের খাঁটি সরিষার তেল বের করে তার গায়ে মালিশ করে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের শরীর থেকে বৃষ্টির বদলে ঝরছিল খাঁটি চন্দনের গন্ধ।’

জীবনহরি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল, ‘তারপর জ্যাঠামশাই?’

‘আরে বলিস না! সরষের তেলের ঝাঁঝালো গন্ধে মেঘটা এমন এক বিকট হাঁচি দিল যে কী বলব! সেই হাঁচির চোটে আমি উড়ে গিয়ে সোজা লটকালাম চাঁদের দেশের কোনায়। চাঁদের বুড়ি তখন চরকা কাটছিল না। সে বসে বসে কাঁঠাল খাচ্ছিল। আমাকে দেখে বলল, ‘কী হে ফণী, আষাঢ় মাসে ছাতা ছাড়া চাঁদে চলে এলি?’

আমি বললাম, ‘বুড়ি পিসি, ছাতা তো মেঘের ডানায় বেঁধে এসেছি। তা তোমার কাঁঠালের একটা কোয়া দাও দেখি, বড্ড খিদে পেয়েছে।’

বুড়ি একটা কোয়া আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। অমনি আমার হাত ফসকে সেটা পড়ে গেল নিচে।’

পঞ্চানন খুড়ো আরেকবার নস্যি নিয়ে বললেন, ‘তা তুমি নামলে কী করে?’

ফণীবাবু বললেন, ‘নামার জন্যই তো এত কা-! সেই কাঁঠালের কোয়াটা নিচে পড়তে পড়তে বিশাল বড় এক কাঁঠাল গাছ হয়ে গেল। গাছটির মগডাল এসে ঠেকল চাঁদে। আমি সেই গাছের পাতা বেয়ে বেয়ে তরতরিয়ে নেমে এলাম মাটিতে। এসে দেখি, সেই হাতি-মেঘটা আমার ছাতা পিঠে দিয়ে আকাশে উড়াল দিয়েছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত যখন আষাঢ় মাসে বেশি বৃষ্টি হয়, আমি বুঝতি পারি—ওই মেঘটা আমার ছাতাটা ফেরত দিতে চাইছে। মেঘের রাজ্যে তো পোস্ট অফিস নেই। পাঠাতে পারছে না। তাই বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে আমায় চিঠি লেখে।’

বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। জীবনহরি হাঁ করে ফণীবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

পঞ্চানন খুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মন্দ বলনি ফণী, তবে কাঁঠালের বীজ ছাড়া গাছ হলো কী করে, সেটা একটু খটকা লাগল।’

ফণীবাবু চটে গিয়ে বললেন, ‘এ সময় কি কেউ বীজ খোঁজে? যুক্তি থুয়ে ভক্তি করো, তবেই না গল্পের রস পাবে!’

চন্ডিম-পের ঠিক সামনের উঠানে তখনই ধপাস করে আষাঢ়ের আকাশ থেকে এসে পড়ল মস্ত বড় একটা বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টির সেই ফোঁটা মাটিতে পড়তেই চারদিক সুবাসিত চন্দনের গন্ধে ম ম করে উঠল! জীবনহরি হাঁ করে চেয়ে দেখল। সে আরও দেখল, উঠানের জলকাদায় আকাশ থেকে একটা আস্ত কালো রঙের ছাতা এসে পড়েছে। ছাতাটার বাঁট দিয়ে টপটপ করে বৃষ্টি নয়, খাঁটি সরষের তেল ঝরছে! প্রকা- মেঘের মস্ত বড় হাতিটার শুঁড় চ-ীম-পের চালের ওপর দিয়ে নেমে এসে ফণীবাবুর নস্যির কৌটোটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আকাশে মিলিয়ে গেল। দূর আকাশ থেকে তখন ভেসে আসছে মস্ত এক হাঁচির শব্দ—‘হাঁচ্চোওওঁ!’

ফণীবাবু মুচকি হেসে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন। পঞ্চানন খুড়ো নস্যির কৌটো হারিয়ে বোকার মতো চেয়ে থাকলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত