সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন

সন্দ্বীপে সেতু নির্মাণ কোনো স্বপ্ন নয়, প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনার

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নের নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত ঐতিহাসিক দ্বীপ সন্দ্বীপ কথা আলোচনায় উঠে আসে। একসময় কৃষি, নৌবাণিজ্য ও জনবসতির জন্য পরিচিত এই দ্বীপ আজও যোগাযোগ সংকট, ভূমি জটিলতা ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের অভাবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

তবে সম্ভাবনার দিক থেকে সন্দ্বীপকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে মনে করেন নব-নির্বাচিত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।

নগর উন্নয়নে মহানগর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃতির অপরিহার্যতা প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে সন্দ্বীপ সম্পর্কে তিনি বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকের মধ্যেই সন্দ্বীপ দেশের অন্যতম পর্যটন, কৃষি ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

একান্ত আলাপচারিতায় তিনি সন্দ্বীপের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেতু নির্মাণ, পর্যটন শিল্প, কোস্টাল ফেরি, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং ভূমি উদ্ধারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

‘সন্দ্বীপের উন্নয়ন শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব সম্ভাবনা’

প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, সন্দ্বীপের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের বাস্তবতা ও সম্ভাবনা দুটোই বিবেচনায় নিতে হবে। চট্রগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(সিডিএ) মহানগর পেরিয়ে উপজেলাগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেবে।

তার ভাষ্য, সন্দ্বীপ বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দ্বীপগুলোর একটি। কিন্তু উন্নয়নের জন্য শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না। প্রয়োজন ঐক্য, প্রশাসনিক সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।

তিনি বলেন, অতীতে অনেক প্রকল্প কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। অনেক উদ্যোগ সমন্বয়ের অভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সন্দ্বীপবাসী উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের দ্বীপগুলোতে পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্যে আন্তরিক ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

সেতু নির্মাণ: স্বপ্ন নয়, বাস্তবতার প্রশ্ন

দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপবাসীর অন্যতম প্রধান দাবি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন।

এ বিষয়ে প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, সন্দ্বীপ সেতু অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প। তাই অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে শুধু আবেগ দিয়ে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তিনি মনে করেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তার মতে, প্রথমে সন্দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। পর্যটন, শিল্প, কৃষি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ ঘটলে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হবে।

পর্যটনই হতে পারে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি

সিডিএ চেয়ারম্যানের মতে, সন্দ্বীপের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

তিনি বলেন,বাংলাদেশে সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের কথা উঠলে সবাই কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার কথা বলেন। কিন্তু সন্দ্বীপেও রয়েছে এর অপার সম্ভাবনা।

তার মতে, পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

হোটেল, রিসোর্ট, সমুদ্রভিত্তিক বিনোদন কেন্দ্র, পর্যটকবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে সন্দ্বীপ জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ স্থান দখল করতে সক্ষম হবে।

প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, সন্দ্বীপের চতুর্পাশে নির্মিত বেড়িবাঁধে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা গেলে উপকূলীয় সুরক্ষা যেমন জোরদার হবে, তেমনি পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

তার মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাও লাভবান হবে।

ভূমি উদ্ধার: উন্নয়নের পূর্বশর্ত

সন্দ্বীপের চরাঞ্চল ও ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের নানা জটিলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,সন্দ্বীপবাসীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তার অভিযোগ, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দ্বীপের চরাঞ্চল এবং ভূমি নিয়ে নানা অনিয়ম ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জোর করে সন্দ্বীপের সকল চর দখল করে নিয়েছিল। এই জায়গা উদ্ধার করতে হবে।

তার মতে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমও গতি পাবে।

ক্রসড্যাম প্রকল্পে নতুন সম্ভাবনা

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ, উড়িরচরের ভাঙ্গন বন্ধে ক্রসড্যাম পরিকল্পনাসহ সন্দ্বীপের উত্তর পশ্চিমে উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কয়েকশত কোটি টাকার যে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে তার ভাষায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভূমি রক্ষা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ওই এলাকা বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে তিনি এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন।

কোস্টাল ফেরি ও নতুন পন্টুন নির্মাণের উদ্যোগ

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কোস্টাল ফেরি চালু এবং নতুন তিনটি পন্টুন নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্দ্বীপের মানুষকে নিরাপদ, নিয়মিত এবং আধুনিক নৌযোগাযোগ সুবিধা দিতে হবে।

তার মতে, অতীতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে সন্দ্বীপ-সীতাকুণ্ড রুটে জনপ্রিয় ফেরি সার্ভিস কাঙ্ক্ষিত সফলতা পায়নি। এসব সীমাবদ্ধতা অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ নৌযাতায়াত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কৃষিতে ফিরতে হবে

সন্দ্বীপবাসীর প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, আমাদের আবার কৃষিতে ফিরতে হবে।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় সন্দ্বীপ ছিল দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদনশীল অঞ্চল। কিন্তু বর্তমানে দ্বীপটি ক্রমেই প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তার মতে, আধুনিক কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।

শিল্পায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে হবে। শুধু চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না, উদ্যোক্তা তৈরিও জরুরি।

তিনি মনে করেন, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’

সন্দ্বীপকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন,মাদক যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। এ বিষয়ে কোনো আপস হবে না।

তিনি জানান, চট্রগ্রাম পুলিশ সুপারের সঙ্গে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি বলেন,সন্দ্বীপের উন্নয়ন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে সবাইকে উন্নয়নের প্রশ্নে এক হতে হবে।

তিনি মনে করেন, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণ একসঙ্গে কাজ করলে সন্দ্বীপের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। সন্দ্বীপ নিয়ে বহু বছর ধরে নানা পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি ও দাবি-দাওয়ার আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে সীমিত।

তবে সেতু, ক্রসড্যাম, কোস্টাল ফেরি, মেরিন ড্রাইভ, পর্যটন শিল্প, কৃষি পুনরুজ্জীবন ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পায়নের মতো উদ্যোগগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলে সন্দ্বীপ শুধু একটি দ্বীপ হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের উপকূলীয় উন্নয়নের অন্যতম মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের ভাষায়, সন্দ্বীপের উন্নয়ন কোনো স্বপ্ন নয়; প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত