ঐক্যে বিজয় বিভেদে পরাজয়

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

ঐক্যের গুরুত্ব অনেক। কোরআন-হাদিস মানুষকে বিভেদ-বিভাজনের অন্ধকার থেকে তুলে এনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। শত্রুতার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিদ্বেষের বদলে সহমর্মিতা, অহংকারের স্থলে তাকওয়া অবলম্বন করাই ইসলামের শিক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন মুসলিম সমাজ কোরআনের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, তখন তারা শক্তি, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারে অনন্য হয়ে উঠেছে। আর যখন তারা বিভক্ত হয়েছে, তখন দুর্বলতা ও অবক্ষয় তাদের গ্রাস করেছে। আজকের বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, আমরা কি সেই কোরআনি আহ্বানের দিকে ফিরে যাব, নাকি বিভেদের পথেই চলতে থাকব? তাই ঐক্যের প্রসঙ্গ নতুন কোনো সেøাগান নয়, এটি আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার, এটি অস্তিত্ব রক্ষার শপথ।

ইসলাম এমন এক দ্বীন, যা মানুষকে শুধু ইবাদতের বন্ধনে নয়, হৃদয়ের বন্ধনেও একত্র করে। এই দ্বীনের আহ্বান ভাষা, বর্ণ কিংবা ভূখণ্ডের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। ইমানই এখানে পরিচয়, তাকওয়াই এখানে মানদণ্ড। অথচ আজ মুসলিম উম্মাহ সেই মৌলিক চেতনা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। মতানৈক্য গৌণ বিষয় থেকে মৌলিক বিভাজনে রূপ নিয়েছে। ভ্রাতৃত্বের জায়গা দখল করেছে সন্দেহ, বিদ্বেষ ও দলীয় অহংকার। কোরআন ও সুন্নাহ যে ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন আজ বিরল। এই বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর ঐক্য শুধু একটি নৈতিক আহ্বান নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। ঐক্যের কোরআনি ভিত্তি, নবীজির গড়া সমাজব্যবস্থা এবং বর্তমান অনৈক্যের কারণ অনুধাবন করলেই স্পষ্ট হয়, মুসলিম জাতির মুক্তি একমাত্র ঐক্যের মধ্যেই নিহিত।

ইমাম রাগেব ইস্পাহানি (রহ.) ‘মুফরদাতুল কোরআন’ গ্রন্থে লিখেছেন, উম্মাহ বলা হয় এমন মানবগোষ্ঠীকে, যাদের মধ্যে কোনো বিশেষ কারণে সংযোগ ও ঐক্য বিদ্যমান থাকে। আর অধিকাংশ তাফসিরবিদ একমত যে, তা হলো ধর্মীয় ও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় এটার বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। যেখানে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা আর কাজকর্মে একতার ফলে মুসলিম জাতির মধ্যে সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করত।

আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন, ‘মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা মদিনাকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং ইমান এনেছিল (তাদের জন্যও এ সম্পদে অংশ রয়েছে), যারা তাদের কাছে হিজরত করে এসেছে তাদের ভালোবাসে। আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে, সেটার জন্য তারা নিজেদের অন্তরে কোনো ঈর্ষা অনুভব করে না। নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা হাশর ৯)

মুসলিম-অমুসলিম সবাই আদম সন্তান। তাই ইসলাম ধর্ম মানুষের অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা সনদে স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে জাতীয় স্বার্থের ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। জনসাধারণের ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় জাতীয় স্বার্থ। যেখানে মানুষের জানমাল নিরাপদ এবং অপরাধ নিষিদ্ধ।

একতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সাহাবিদের ভ্রাতৃত্ববোধ এত প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল যে, একজন অন্য ভাইয়ের জন্য নিজ ধন-সম্পদ ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করত না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিভক্ত হইও না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩)

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের উৎস একত্ববাদের বিশ্বাস। ইবাদতের ঐক্যস্বরূপ সমগ্র দুনিয়ার মুসলমান আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। পবিত্র হজের মৌসুমে মক্কায় হজ পালন করে। সব মুসলমান একই কোরআন ও হাদিস পাঠ করে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রেখে যাওয়া আদর্শের অনুসারী সবাই। তবে আজ মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ফাটল কেন? আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা তাদের মতো হইও না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে, তাদের কাছে স্পষ্ট নিদর্শনগুলো আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আজাব।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৫)

ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা একটি দেহের মতো। আর মুসলমানদের গৌণ বিষয়ে মতানৈক্য হলো দেহের বিষফোড়া, যা যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহের ঐক্যে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো ব্যাপারে আপনার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর কাছে। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদের সে বিষয়ে অবগত করবেন।’ (সুরা আনআম ১৫৯)

লেখক : ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত