একটি বিড়াল নিয়ে বিবাদে জড়িয়েছেন দুই প্রতিবেশী। মালিকানা নিশ্চিতের জন্য এক পর্যায়ে তাদের আদালতে যেতে হয়। সেখানে এক সময় বিড়ালের মালিকানার ফয়সালা হলে মালিকানা ফিরে পাওয়া প্রতিবেশী ঘরে ফিরে দেখেন বিড়ালকে খাওয়ানোর মতো দুধ আর তার ঘরে নেই। কারণ, মালিকানা ফিরে পাওয়ার আশায় শেষ সম্বল ‘দুধ দেওয়া গরু’টিকেই বিক্রি করে দিতে হয়েছে। এরকম গল্প থেকেই সম্ভবত ‘আদালতে যাওয়ার মানে একটি বিড়ালের জন্য একটি গরু হারানো’ প্রবাদের সূচনা। অপ্রাসঙ্গিক হলেও গল্প এবং প্রবাদটি মনে পড়ে।
গত সপ্তাহে ‘অফিস সহায়ক পদে চাকরি, ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই ইঞ্জিনিয়ার-এমবিএ-মাস্টার্স-অনার্স পাস’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন দেখে। কৌতূহলী হয়ে প্রতিবেদনটি পাঠ করে জানা যায়, পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো তদবির বা অর্থ লেনদেন ছাড়াই মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন ১৮ জন। স্বাভাবিকভাবেই সংবাদের এই অংশটি সুখকর, আশাজাগানিয়া। নিয়োগপ্রাপ্ত সবাইকেই অভিনন্দন। কিন্তু সংবাদের পরের অংশ আর সুখের তো নয়ই, বরং রীতিমতো অস্বস্তির, খোঁচাতে থাকে। অস্বস্তির কারণ দুটি। প্রথম- যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের সবাই অতিরিক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন। মূলত জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাস। আগে এই পদটির শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল ৮ম শ্রেণি পাস। কিন্তু এখানে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত। কেমন উচ্চশিক্ষিত? নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন ট্রিপল-ই-তে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, রয়েছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং, অর্থনীতি-রসায়ন-মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর প্রার্থী, রয়েছেন এমবিএ-সম্পন্ন প্রার্থীও। ১৮ জন প্রার্থীর শুধু একজন উচ্চমাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ সবারই রয়েছে চাহিদার অতিরিক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা।
দ্বিতীয় কাজ ও সুযোগের তুলনায় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীর অস্বাভাবিক সংখ্যা। অফিস সহকারীর এই ১৮টি পদে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন প্রায় ৮ হাজার আবেদনকারী। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার প্রার্থী পরীক্ষায় উপস্থিত হন এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৪৪ জন। পরে মৌখিক পরীক্ষায় ১৮ জন উত্তীর্ণ হয়ে চাকরির জন্য মনোনীত হন। এখন প্রশ্ন, যেখানে মাধ্যমিক পাস একজনের সুযোগ রয়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে আসা প্রার্থীদের ভিড় কেন? কারণ, আমাদের চাহিদা এবং উৎপাদনে সমন্বয় নেই। নেই সঠিক পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা। দেশে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৭৪টি। সংখ্যাটি চলতি সপ্তাহেই সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সরকারি ৫৬টি, বেসরকারি ১১৬টি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ২টি। এছাড়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশের জেলা, উপজেলাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর-পর্বে নানান বিষয়ে পড়া ও ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই যে এত বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে আমরা কী শিখছি? নাকি আমরা যা শিখছি, তা প্রয়োগের জায়গা নেই?
আমাদের শ্রমবাজার ছোট, এটা যেমন সত্যি তেমনি সত্যি আমাদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব। চলতি সংসদেই একজন প্রতিমন্ত্রী সংসদে আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলেছেন, তিনি উদাহরণ টেনেছিলেন সিঙ্গাপুরের শিক্ষার সঙ্গে। আর এ কথাও তো সুবিদিত ও বহুল আলোচিত যে, স্নাতক-স্নাতকোত্তরসম্পন্ন করে আসা শিক্ষার্থীরাও শুদ্ধভাবে ইংরেজিতে তো দূরের কথা মাতৃভাষা বাংলাতেও একটি আবেদনপত্র লিখতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। এই যে এত এত বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী, যারা প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়ে আসছেন, তাদের কাজের সুযোগ কোথায়? একজন ট্রিপল-ই তে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার কেন অফিস সহকারীর চাকরিতে আগ্রহী হবেন? একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার বা রসায়ন বিদ্যা, মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তরসম্পন্ন করা প্রার্থীই বা কেন অফিস সহায়কের চাকরি বেছে নেবেন? কোনো কাজই ছোট নয়, কিন্তু তিনি যে কাজের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছেন, সে কাজ করবেন বলে দীর্ঘ সময় প্রস্তুতি নিয়েছেন, পড়ালেখা করেছেন যার বা যাদের পেছনে রাষ্ট্র হাজার হাজার টাকা ভর্তুকি দিয়েছে, সেই অধিত বিদ্যা কেন কাজে লাগবে না? এই প্রশ্ন করার সময় কি আসেনি?
নাকি আমরা দিন দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটিকেই ধারণ করতে অক্ষম হয়ে উঠছি? প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমøান দত্ত ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার সমস্যা’ শিরোনামের প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘শুধু কেরানি তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় চালানো তুচ্ছ বস্তুর উৎপাদনে দামি যন্ত্রের ব্যবহারের মতোই সামাজিক সম্পদের অপচয়।’ অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন শুধু কেরানি তৈরি, শুধু সার্টিফিকেট বিতরণের কাজটিই বছরের পর পর নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা তো কেরানি তৈরির ধারণা নয়। আমরা যে উচ্চশিক্ষার নামে, সার্টিফিকেট বিতরণের নামে যে সামাজিক সংকট তৈরি করছি, অসম সমাজের দিকে, অসাম্যজনিত তিক্ততা তৈরির দিকে এগিয়ে চলেছি, এখন তা সমালোচকের দৃষ্টিতে বিচার করার সময় এসেছে।
ভেবে দেখার সময় এসেছে, আমাদের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যুগের উপযোগী কি না। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন ডিগ্রিধারী অথবা কত হাজার ছেলে বেরুলো, সেটি যদি আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, তাহলে প্রকৃত সমস্যার দিকে নজর না দিয়ে বরং দেশের নানা স্থানে আরও আরও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিই উত্থাপিত হবে। তাই যতদিন না আমরা এই ধারণা থেকে বেরুতে পারব, ততদিন তুচ্ছ বস্তুর জন্য সামাজিক সম্পদের অপচয় হতেই থাকবে। ফলে পাবনায় চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশংসায় ভাসলেও তা বারবার কিংবা ক্ষণে ক্ষণে জুতোর ভেতরে হঠাৎ ঢুকে পড়া ক্ষুদ্র আলপিনের মতো খোঁচাতে খোঁচাতে মনে করিয়ে দেবে, আমরা একটি বিড়ালের জন্য গরু হারিয়ে ফেলছি না তো?
লেখক : কবি ও সাংবাদিক