অবিবেচনাপ্রসূত নিয়োগ-পদোন্নতি নয়

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০২:১৮ এএম

কিছুদিন আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তিনি দায়িত্বে ‘অসম্ভব চাপ’ অনুভব করছেন। ওই আলাপের অনেকগুলো অংশ ঘিরেই বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই অসম্ভব চাপ অনুভবের কারণ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যা, সমাধানের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের প্রত্যাশা এ তিনটিকে কারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তবে এ সমস্যার মূলে সম্ভবত বিকেন্দ্রীকরণের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই বেশি দায়ী। কারণ নতুন সরকার এরই মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এরই মধ্যে প্রস্তাব করেছে। এবারের বাজেটে সরকারের অনেকগুলো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা আছে। এমনকি ২০৩৪ সাল নাগাদ দেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন সরকারকে সহায়তা করতে কতটা প্রস্তুত রয়েছে?

সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, দেশের ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কোনো পূর্ণকালীন সচিব নেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরদিনই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য বলছে, মোট ৮৪ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে ১০ জন এখন কোনো কার্যকর দপ্তরের দায়িত্বেই নেই; তাদের অধিকাংশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হিসেবে আছেন। এই চিত্র নতুন কিছু নয়। কিন্তু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণ বাজেট বাস্তবায়নের মুখে এসে এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। কারণ মন্ত্রণালয়ে সচিব বা সিনিয়র সচিব পদের অনুপস্থিতি গোটা প্রশাসনযন্ত্রে স্থবিরতা নিয়ে আসে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রশাসনিক সেবা ও কার্যক্রমের গতিও কমে আসতে দেখা যায়। এজন্য সাধারণ মানুষ সময়মতো সেবা পান না। সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থও সঠিক সময়ে ব্যয় করা যায় না। বিশেষত প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যে বিনিয়োগ রয়েছে তা উপযুক্ত সময়ে পৌঁছুবে কি না এটি নিয়েও জটিলতা বাড়তে শুরু করছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় সরকারের অনেক ইতিবাচক উদ্যোগও সমালোচনার মুখে পড়ে। সচিব-শূন্যতা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, এর সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও ট্যারিফ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান। সচিব না থাকলে নীতিগত অনুমোদন যেমন শুল্ক-সুবিধা, রপ্তানি প্রণোদনা বা বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তআটকে থাকার ঝুঁকি বাড়ে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষুণœ করতে পারে। বিডা, বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষ এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব না থাকায় বড় বিনিয়োগ প্রস্তাবে নীতিগত ছাড়পত্র পেতে সময় বেশি লাগতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি ও কর্মসংস্থান-নির্ভর খাত পরিচালনা করে। নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় খাত-সংক্রান্ত প্রণোদনা বা সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা রপ্তানি আয় ও শ্রমিকের কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। আইসিটি বিভাগের অধীনে স্টার্টআপ বাংলাদেশ, হাই-টেক পার্ক ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্যোগ রয়েছে। সচিব না থাকলে এসব প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে ধীরগতি আসতে পারে, যা ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানির লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

যেকোনো সরকারের নীতি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সব উন্নত ও অর্থনীতিতে অগ্রসর দেশগুলো তাদের জনপ্রশাসনে ব্যাপক আধুনিকায়ন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে গতি এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বরাবরই নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। কখনো পিরামিড কাঠামোর মধ্যে আনুপাতিক ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য, আবার কখনো অহেতুক পদায়নের বিষয়টি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এর আগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জনপ্রশাসনকে স্বচ্ছ ও দক্ষ করার বিষয়ে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি যোগ্য ও দক্ষ কাউকে শনাক্ত করতে পারলে প্রশাসনে তার দক্ষতার নিরিখে নিয়োগ দিতেন। দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে তিনি নাগরিক সেবা যেমন সুগম করেছিলেন তেমনি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও ব্যাপক সফলতা পেয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, সরকার যদি দক্ষ, জনবান্ধব ও কাজ করার মানসিকতা রাখে এমন যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনে সঠিক সময়ে নিয়োগ দিতে পারে তাহলে জনপ্রশাসন গতিশীল হবেই। মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা সচিব। নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এই তিনটি কাজেই তার ভূমিকা কেন্দ্রীয়। সেই পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু সমস্যা তৈরি হয়। যেমন কোনো মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাধারণত বড় বা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর দিতে দ্বিধা করেন, কারণ দায়বদ্ধতার প্রশ্ন থেকেই যায়। এ জন্য সচিব না থাকলে অনেক জরুরি নীতিমালা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যাহত হয়। কারণ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রায়ই অন্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের সমপর্যায়ে আলোচনায় বসার পূর্ণ এখতিয়ার রাখেন না। এপ্রিলের পর দীর্ঘদিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব ছিলেন না। আইসিটি বিভাগও মার্চ থেকে কার্যত নেতৃত্বহীন। এই ধরনের ধারাবাহিক শূন্যতা দপ্তরের দৈনন্দিন কাজে গতি কমিয়ে দেয়, এমনকি যেখানে রুটিন কাজ চলছে বলে দাবি করা হয়, সেখানেও।

অর্থবছরের শুরুতেই জনপ্রশাসনে নেতৃত্বশূন্যতা বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন, ক্রয় পরিকল্পনা, প্রকল্প অনুমোদন এবং ব্যয় পর্যবেক্ষণ এই পুরো চক্রে সচিবের সিদ্ধান্তই চালিকাশক্তি। এসব দিক বিবেচনায় নতুন সরকারকে বাজেট লক্ষ্যমাত্রা পূরণে জনপ্রশাসনকে গতিশীল করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি-নির্ভরতা কমাতে ফাইল চলাচল ডিজিটালি পর্যবেক্ষণযোগ্য রাখা, যাতে নেতৃত্ব পরিবর্তনেও কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মাসিক ভিত্তিতে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে শূন্যতার কারণে কোথায় কাজ পিছিয়ে পড়ছে তা চিহ্নিত করা জরুরি। জনপ্রশাসনে অবিবেচনাপ্রসূত নিয়োগ, পদোন্নতি যেন না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ বাজেটের বড় একটি অংশ পরিচালন ব্যয়ে যায়। তাই জনপ্রশাসনে অহেতুক নিয়োগ ও পদোন্নতি এড়ানোর মাধ্যমে ব্যয়সাশ্রয় নিশ্চিত করা যাবে। প্রয়োজনে সরকারের আকার পুনর্বিবেচনা করে ছোট করা যেতে পারে। প্রশাসনিক কাঠামোয় অনেক শূন্যপদ রয়েছে। সেগুলোও পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কারণ সরকারের পরিচালন ব্যয় কমাতে হলে প্রশাসনের কর্মীদের সংখ্যা না কমিয়ে পদ ও দায়িত্বের বিন্যাসে বদল আনা দরকার। কোনো কর্মীই যেন দায়িত্ব, জবাবদিহির বাইরে না থাকে তা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য সরকারকে জনপ্রশাসন কাঠামো সংস্কারের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

সিভিল সার্ভিসের ভেতরের দলাদলি ও বিভাজন সামাল দেওয়াই প্রশাসনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে কাঠামোগত কয়েকটি সংস্কার নিয়েও ভাবা জরুরি। বিতর্ক এড়াতে জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা ও সততার সুনির্দিষ্ট মানদন্ডে পদায়ন-পদোন্নতি নীতি প্রকাশ্য ও পূর্বনির্ধারিত করা দরকার। কোনো সচিবকে অনির্দিষ্টকাল দপ্তরহীন রেখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখার সংস্কৃতি কমিয়ে একটি যুক্তিসংগত সময়সীমার মধ্যে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ কমাতে জ্যেষ্ঠ আমলা ও বহিরাগত বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি পরামর্শক বোর্ড গঠনের কথা ভাবা যেতে পারে, যা শীর্ষ পদে নিয়োগের সুপারিশ করবে। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত প্রশাসনিক সংস্কার সুপারিশগুলোর মধ্যে যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো ধাপে ধাপে কার্যকর করা, যাতে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের শূন্যতা কাঠামোগতভাবেই কমে আসে।

প্রশাসনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব হলে অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রকল্প অনুমোদন ও ক্রয় প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়। ফলে শেষ কয়েক মাসে ব্যয় তাড়াহুড়া করে সারতে হয়। এটি বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের পরিচিত একটি সমস্যা। এসব প্রকল্পের গুণগত মান ও অর্থের সদ্ব্যবহারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে বেশিদিন হয়নি। এরই মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা সামলাতে সতর্ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার যৌক্তিকতা অনুভব করা দরকার। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রশাসনকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার বিষয়টিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। দেশে প্রযুক্তির বিকাশ সর্বস্তরে সমান নয়। কিন্তু এও সত্য, সরকারি ব্যবস্থাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার টেকসই মাত্রা পায়নি। জনপ্রশাসনের কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য ডিজিটাল নথি কার্যক্রমের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ নথি তৈরির কাজ যেন নির্ধারিত সময়ে শতভাগ সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন স্বল্প সময়ের জন্য এসব কাজের তদারকি করতে পারেন। পুরো ব্যবস্থাকে ফাইলনির্ভর না রেখে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে এলে প্রধানমন্ত্রীর কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

সরকারের সামনে অনেকগুলো বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে বাজেট পাস হওয়ার পর তা সুষ্ঠুভাবে ও গুণগত মান রক্ষা করে বাস্তবায়ন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেট বাস্তবায়নের ক্যালেন্ডারটি কখনই অপেক্ষা করে না। এ জন্য প্রশাসনে সতর্কতা ও গতি এ দুটো একই সঙ্গে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। অগ্রাধিকারভিত্তিক নিয়োগ, স্পষ্ট ক্ষমতা অর্পণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই জনপ্রশাসনে এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

লেখক : জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয় সাবেক উপাচার্য, শাবিপ্রবি।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত