বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

প্রকৃতির অকৃপণ আশীর্বাদে সমৃদ্ধ বরিশাল। বিস্তীর্ণ জমি, নদীপথের সহজ যোগাযোগ, পায়রা সমুদ্রবন্দরের কাছে অবস্থান এবং পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সম্ভাবনাই রয়েছে এ অঞ্চলে। তবু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভাবে দক্ষিণাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও প্রতি বছর হাজারো তরুণ-তরুণীকে কর্মসংস্থানের খোঁজে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটতে হচ্ছে।

এবার সেই চিত্র বদলের আশায় বুক বাঁধছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। বরিশালে একটি পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ঘোষণাকে কেবল একটি শিল্প প্রকল্প নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক মুক্তির নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের বিশ্বাস পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বরিশাল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থান, কমবে রাজধানীমুখী মানুষের চাপ।

সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থী মিলন বলেন, ‘পার্টটাইম চাকরির জন্যও অনেক চেষ্টা করেছি, সুযোগ পাইনি। চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধাও এখানে সীমিত। তাই পড়াশোনা শেষ করলেই বেশিরভাগ তরুণকে ঢাকার দিকে ছুটতে হয়।’

নারী উদ্যোক্তা মো. সেলিমা বলেন, ‘নিজের এলাকা ছেড়ে নতুন পরিবেশে গিয়ে কাজ করা সহজ নয়। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি আরও কঠিন। বরিশালেই যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তাহলে নারীরাও নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাবেন।’

শিক্ষার্থী মো. হাবিব বলেন, ‘বরিশালে ইপিজেড বাস্তবায়ন হলে আমাদের মতো তরুণদের আর কর্মসংস্থানের জন্য অন্য জেলায় যেতে হবে না। নিজের জেলা থেকেই আমরা ভবিষ্যৎ গড়তে পারব।’

স্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু ঘোষণা নয়, এই মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দ্রুত জমি অধিগ্রহণ, গ্যাস সরবরাহ এবং আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষ্য পদ্মা সেতুর কারণে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এবং কাছাকাছি পায়রা সমুদ্রবন্দরের অবস্থান বরিশালকে শিল্প বিনিয়োগের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক স্থানে পরিণত করেছে। এসব সুবিধা কাজে লাগানো গেলে কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানি আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্পকারখানা, যার মাধ্যমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বরিশাল সুজনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ তৈরি হোক, যেখানে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং শ্রমনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণ হবে। তাহলেই এ অঞ্চলের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।’

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘শিল্পায়নের পাশাপাশি কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে এ প্রকল্প টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি এবায়দুল হক চান বলেন, ‘আমাদের পায়রা সমুদ্রবন্দর রয়েছে। সরকার যদি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে বরিশালে উৎপাদিত পণ্য এ বন্দর দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এতে শিল্প উদ্যোক্তারা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি দেশের রপ্তানি আয়ও বাড়বে।’

বরিশালে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপনে সরকার আন্তরিক বলে জানিয়েছে বিভাগীয় প্রশাসন। বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিস্তার ঘটবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং বেকারত্ব অনেকাংশে কমে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত