২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উত্থাপিত নির্দিষ্টকরণ বিল ২০২৬ পাসের মধ্য দিয়ে এই বাজেট অনুমোদন হয়। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। বাজেটে মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন অর্থবছরের শুরুর দিন আজ ১ জুলাই থেকে এ বাজেট কার্যকর হচ্ছে।
গত সোমবার রাতে শুরু হওয়া বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীরা তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয় নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এ ছাড়া মঞ্জুরি দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে বিরোধী দলের ৪৩ জন সংসদ সদস্য ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ৫৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবির মধ্যে ৩৬টির ওপর আলোচনার সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।
গতকাল জোহরের নামাজের বিরতির পর ৩৩ নম্বর ছাঁটাই প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে সংসদের সময় বাঁচাতে প্যাকেজ আকারে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করে নেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমার মনে হয়, ট্রেজারি বেঞ্চ আপনার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। প্রস্তাবগুলো মন্ত্রী উত্থাপন করলে সরাসরি প্রস্তাবটি ভোটে দেওয়া হবে। পরের ২৫টি মঞ্জুরি দাবি সরাসরি ভোটে দেওয়া হয়। এর আগে যেসব মঞ্জুরি দাবি নিয়ে আলোচনা হয়, সেগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরুসহ সরকার ও বিরোধী দলের মোট ২৯১ জন সংসদ সদস্য বাজেট নিয়ে ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা করেন।
পাস হওয়া বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ৮ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। এবারের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্দিষ্টকরণ বিলের তফসিল অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে অর্থ বিভাগের জন্য। এ খাতে দায়যুক্ত ব্যয় ও সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি মিলিয়ে মোট ৮ লাখ ৩০ হাজার ৫৫১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ২৪৮ কোটি ৯১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য ৪০ হাজার ২৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ৯১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, পরিকল্পনা বিভাগের জন্য ৩৬ হাজার ২৫১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩২ হাজার ৪১৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৩০ হাজার ৪৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি ২ লাখ টাকা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জন্য ২ হাজার ৩৪৯ কোটি ২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ১৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। খাদ্য হিসাব, ঋণ ও অগ্রিম, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং কাঠামোগত সমন্বয় বাদে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় ধরা হয়েছে অন্তত ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
এবারের বাজেটে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ২০ শতাংশের বেশি। গতবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ভ্যাট থেকে। এ খাতে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে। বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিদেশি অনুদান থেকে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার। নতুন বাজেটে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যও ধরা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এটি বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৬-০৭ অর্থবছরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মাধ্যমে সর্বশেষ জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছিল।