‘সংকোচনমূলক’ মুদ্রানীতি ঘোষণা

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৯ এএম

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ চেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে মুদ্রানীতির ‘সংকোচনমূলক ধারা’ বজায় রাখা হবে এবং নীতি সুদহার আগের মতোই ১০ শতাংশ থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারের রাজস্ব নীতির সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী মাসগুলোয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতি আরও শক্তিশালী হবে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে মুদ্রানীতি উপস্থাপন করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। এ সময় ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, সারোয়ার আলমসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রপ্তানিমুখী ও বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কঠোর মুদ্রানীতির ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানো পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

হাবিবুর রহমান উল্লেখ করেন, মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে সরকার রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে সমন্বিত প্রণোদনা গ্রহণ করেছে। সেই অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।

মুদ্রানীতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় অর্থনীতির সামনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ অতিরিক্ত চাহিদাজনিত নয়; বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারের কাঠামোগত সমস্যার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করেই মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

মুদ্রানীতির কাক্সিক্ষত অর্জনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, মুদ্রানীতি কখনোই একা অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি কার্যকর করতে হলে রাজস্বনীতি, সরবরাহ ও চাহিদাপক্ষের নীতিসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির সমন্বিত বাস্তবায়ন জরুরি।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি পুরোপুরি সফল হয়েছে এমন দাবি করা যাবে না। তবে মূল্যস্ফীতি যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন নীতিগত সুদের হার (পলিসি রেট) ১০ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার প্রবণতা কমেছে এবং ধীরে ধীরে তা নিয়ন্ত্রণে আসতে সহায়তা করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে মুদ্রানীতি অবশ্যই কার্যকর। তবে এর কাক্সিক্ষত সুফল পেতে হলে রাজস্বনীতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি গতকাল জারি করা হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে থাকা, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে, এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আমরা কিন্তু এখন আর পুনঃতফসিলিকরণ একেবারেই উৎসাহিত করছি না।’

গভর্নর আরও জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, যেন এই আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বিষয়ে অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও কাক্সিক্ষত মাত্রায় না নামায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্ক ও সংকোচনমূলক অবস্থান অব্যাহত রাখা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। নীতিসুদহার অপরিবর্তিত রাখা এবং বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতির একটি বড় অংশের পেছনে রয়েছে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম এবং বাজার ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতা। ফলে মুদ্রানীতির পাশাপাশি রাজস্বনীতি, বাজার তদারকি এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

মাসরুর রিয়াজ আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় থাকলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা গেলে ধীরে ধীরে নীতিসহায়তায় ভারসাম্য আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত