সমর্থকদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে জার্মানি

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১২ এএম

বিশ্বকাপ মানেই বিস্ময়। বিশ্বকাপ মানেই আনন্দ আর অশ্রুর এক অদ্ভুত সহাবস্থান। কিন্তু চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির জন্য এবারের বিদায়টা যেন শুধুই একটি পরাজয় নয়, বরং একটি যুগের দীর্ঘশ্বাস। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-১ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে জার্মানি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম টাইব্রেকারে হারলেন জার্মানরা, যে দলটি একসময় পেনাল্টি শুটআউটকে নিজের শক্তির প্রতীক বানিয়েছিল।

ম্যাচশেষে গ্যালারির দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। লাল-কালো-হলুদ পতাকা হাতে অসংখ্য সমর্থক অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে ছিলেন মাঠের দিকে। আমাদের মতো জার্মান সমর্থকদেরও ছিল একই দশা। কারও চোখে অবিশ্বাস, কারও মুখে নীরবতা। ফুটবলের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যটি যেন আবারও সামনে এলো একটি কিকই বদলে দিতে পারে একটি জাতির স্বপ্ন।

বিশ্বকাপে জার্মানির নাম উচ্চারণ হলেই মনে পড়ে শৃঙ্খলা, দৃঢ়তা ও চাপের মুহূর্তে অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তির কথা। অথচ সেই দলই টানা কয়েকটি বিশ্বকাপে হতাশার গল্প লিখে চলেছে। ২০১৮ ও ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর ২০২৬ সালে নকআউটের প্রথম ধাপেই থেমে যেতে হলো তাদের। এটি কেবল একটি ম্যাচ হারার ঘটনা নয়; বরং জার্মান ফুটবলের আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার উপলক্ষ।

ম্যাচের নাটকীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয় অতিরিক্ত সময়ে জোনাথান তাহেরের বাতিল হওয়া গোল। ভিএআর পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল হয়, আর সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। সাবেক জার্মান তারকা ইলকে গুনদোগান প্রকাশ্যেই ক্ষোভ ঝাড়েন। তার মতে, এমন হালকা সংস্পর্শে গোল বাতিল করা অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে যখন পুরো ম্যাচজুড়েই অনেক শারীরিক সংঘর্ষকে খেলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

আরেক সাবেক জার্মান আন্তর্জাতিক থমাস হিজলসপারজার আরও কঠিন ভাষায় বলেছেন, ‘জার্মানি লড়াই করতেই ভুলে গেছে।’ তার এ মন্তব্যে কেবল হতাশাই নয়, বরং বর্তমান দলের মানসিক দুর্বলতারও প্রতিফলন রয়েছে। একসময় যে দল শেষ বাঁশি পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে চেপে ধরত, সেই দলটিই এখন চাপের মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। তবে এই পরাজয়ের সব কৃতিত্ব জার্মানির ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ রাখলে প্যারাগুয়ের প্রতি অবিচার হবে। তারা অসাধারণ শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভ, রক্ষণভাগের অবিচল দৃঢ়তা এবং টাইব্রেকারে স্নায়ুচাপ সামলে নেওয়ার ক্ষমতা সব মিলিয়ে তারা প্রমাণ করেছে বিশ্বকাপে নাম নয়, পারফরম্যান্সই শেষ কথা।

জার্মান সমর্থকদের কষ্টের আরেকটি কারণ হলো এই দলটি ঘিরে প্রত্যাশা ছিল অনেক। নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছিল তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য সমর্থক লিখেছেন ‘এটি শুধু হার নয়, হৃদয়ভাঙার আরেকটি রাত।’ ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনাতেও জার্মানির এই বিদায়কে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে একইভাবে মরক্কোর কাছে নেদারল্যান্ডসের হারও হৃদয়বিদারক। কেঁদেছেন ডাচ ফুটবলাররা। ফুটবলে টাইব্রেকার ভাগ্যের নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। নেদারল্যান্ডস পুরো ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যরে ঝলক দেখালেও শেষ মুহূর্তে সেই আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে মরক্কো অসাধারণ ধৈর্য ও শৃঙ্খলা দেখিয়েছে। পেনাল্টিতে সফল হতে শুধু দক্ষতা নয়, স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণও জরুরি। নেদারল্যান্ডসের দুটি মিসই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এই হার তাদের জন্য হতাশার হলেও ভবিষ্যতের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে। মরক্কো প্রমাণ করেছে, দলগত সংহতি ও বিশ্বাস থাকলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেও হারানো সম্ভব। নকআউট ফুটবলে ছোট ভুলেরই সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়। ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। আজ যে দল কাঁদছে, আগামীকাল তারাই হয়তো আবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসবে।

ইতিহাস বলে, জার্মানি কখনো দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকে না। প্রতিটি ব্যর্থতা থেকেই তারা নতুন করে নিজেদের গড়ে তোলে। কিন্তু এ মুহূর্তে সেই আশার কথা হয়তো কোনো জার্মান সমর্থকের মন ছুঁতে পারবে না। কারণ তাদের হৃদয়ে এখন শুধু একটি ছবিই ভাসছে টাইব্রেকারের শেষ শটের পর প্যারাগুয়ের উল্লাস আর জার্মান ফুটবলারদের নত মুখ। এটাই বিশ্বকাপ। এখানে এক দলের উৎসবই অন্য দলের আজীবনের বেদনা।

তবে একটা কথা না বললেই নয়, পেলে-নেইমার যেমন ব্রাজিলকে এবং ম্যারাডোনা-মেসি যেমন আর্জেন্টিনাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন, ফ্রেঞ্চ বেকেনবাওয়ারের পর জার্মানিকে বিশে^র কাছে চেনানোর মতো সে রকম কোনো তারকা এখন নেই বললেই চলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত