ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মানুষের কাছে মেঘনা শুধু একটি নৌপথ নয় বরং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের প্রতীক। নিরাপদ যাতায়াতের একমাত্র বাহন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সি-ট্রাক, যা প্রায় ছয় মাস ধরে বন্ধ। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ফিটনেসবিহীন ট্রলার, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ছোট স্টিলবডি লঞ্চে পাড়ি দিচ্ছেন উত্তাল মেঘনা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ডেঞ্জার জোনে চলছে অবৈধ যাত্রী পরিবহন। এ নিয়ে নেই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কোনো নজরদারি। সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি তজুমদ্দিন লঞ্চঘাটে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মনপুরা থেকে একটি কাঠের মালবাহী ট্রলারে শতাধিক যাত্রী এসে পৌঁছে। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ট্রলারের ভেতরের অংশে গাদাগাদি করে বসে আছেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। ট্রলারে নেই কোনো লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া বা অন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম। একই ট্রলারে যাত্রীদের সঙ্গে বহন করা হচ্ছে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি এবং বিভিন্ন ভারী মালামাল।
বিকেলে মনপুরাগামী ফিরতি ট্রলারেও একই দৃশ্য দেখা যায়। প্রচন্ড গরম, বৈরী আবহাওয়া এবং উত্তাল নদীর ঢেউ উপেক্ষা করে মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায়।
জানা গেছে, প্রতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ সময় সি-সার্ভে সনদ ছাড়া কোনো নৌযানে যাত্রী পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই প্রতিদিন ট্রলার ও ছোট নৌযানে যাত্রী পরিবহন চলছে।
মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথে চলাচলকারী বিআইডব্লিউটিসির ‘এসটি ইলিশা’ সি-ট্রাকটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় ঝুঁকি নিয়েই এ পথে চলাচল করতে হচ্ছে জানিয়ে মোছা. নাসরিন আক্তার বলেন, ‘ট্রলারে ওঠা মানেই ভয়। কিন্তু মনপুরাবাসীর সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। বাধ্য হয়েই জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হচ্ছে।’ স্থানীয়রা বলছেন, মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এখানে নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক সি-ট্রাকের বিকল্প নেই। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, ‘মনপুরা-তজুমদ্দিন রুটটি ডেঞ্জার জোন। এ পথে অবৈধ ট্রলার চলাচলের অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, ‘আগের ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সি-ট্রাকটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। পরে ইজারা হস্তান্তর এবং যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের কারণে বিলম্ব হয়েছে।’ দ্রুতই বিকল্প সি-ট্রাক দিয়ে এ রুটে যাত্রীসেবা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে সম্প্রতি ভোলা সফরকালে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী দ্বীপাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত মানসম্মত নৌযান চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কবে দেখা যাবে মনপুরাবাসী সে বিষয়ে গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।