ইউরোপজুড়ে চলেছে স্মরণকালের সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ। তীব্র তাপপ্রবাহে কদিকে যখন জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠছে, অন্যদিকে দেশে দেশে বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনসহ ইউরোপের অনেক দেশেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। গতকাল বুধবার স্প্যানিশ কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহে স্পেনে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একইসঙ্গে দেশটিতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির সরকারি কার্লোস তৃতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানায়, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় অন্তত ১ হাজার ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাকে সরাসরি তাপজনিত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা ২০২৫ সালের জুন মাসের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। গত বছর জুনে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪০৭, যাকে সে সময় পর্যন্ত স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল বলে জানায় দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা- এইএমইটি।
এইএমইটি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাস স্পেনে রেকর্ড সংরক্ষণের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ সময়। এ সময়ে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এইএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস ছিল দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন। এ মাসে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) বলেছে, জুনের শেষ দিকে ইউরোপজুড়ে আঘাত হানা তাপপ্রবাহটি মহাদেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল এবং জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে জুন মাসে এমন পরিস্থিতি ‘প্রায় অসম্ভব’ হতো।
এই তাপপ্রবাহের সময় জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরিতে সর্বকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যায়। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডেও জুন মাসের নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়। ফ্রান্সেও গড় তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়েছে। সম্প্রতি ফরাসি স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ জানায়, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে; এদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ছিলেন। সংস্থাটি বলেছে, যেসব অঞ্চল সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’-এর আওতায় ছিল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিস ও তার আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে বাসায় মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এদিকে, জার্মানিতে তাপপ্রবাহের মাত্রা কিছুটা কমেছে। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে দেশটিতে পানিতে ডুবে ৩০ জনের বেশি মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পুরুষ। রয়েছে কয়েকজন কিশোরও। জার্মানির জীবন রক্ষা সংস্থার (ডিএলআরজি) তথ্য অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রচণ্ড গরমে গোসল বা সাঁতার কাটতে গিয়ে অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত সাতটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। ডিএলআরজির পরিসংখ্যানে শুধু পরিচয় জানা গেছে এমন ব্যক্তিদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাদের এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এলবে নদীতে এখনো এক সাঁতারু ও স্যাক্সনির পোহল জলাধারে এক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। জার্মানির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, প্রায় চার দিন ধরে তীব্র তাপপ্রবাহের পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে সাময়িক স্বস্তি মিলেছে। তবে আগামী ১০ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত তাপমাত্রা আবার অনেকটা বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।