জুনে ঊর্ধ্বগতি, বছর শেষে তবু রপ্তানি আয় কম

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয় আকস্মিক বৃদ্ধি পেলেও তা পুরো বছরের ঘাটতি কাটিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট হয়নি। গতাকাল বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ সাময়িক পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। তবে জুনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পুরো অর্থবছরের রপ্তানি আয় কমেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) রপ্তানি খাত ছিল অনেকটাই ধীর গতিতে ছিল। এ সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ৪৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম। বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় রপ্তানি খাত চাপের মধ্যে ছিল। সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৫৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বছর শেষে প্রকৃত আয় সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে অবস্থান করেছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও জুন মাসের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি নতুন অর্থবছরের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এতে রপ্তানিকারকদের আস্থা বাড়বে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে গতি ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক (আরএমজি) জুন মাসে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার।

তবে এই প্রবৃদ্ধিকে প্রকৃত বাজারভিত্তিক প্রবৃদ্ধি বলতে নারাজ নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তার মতে, এ বছরের জুনে ঈদুল আজহার ছুটির সময়ের পার্থক্যের কারণে কারখানাগুলো গত বছরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি কর্মদিবস পেয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বেশি দিন উৎপাদন চালু থাকার কারণে, নতুন রপ্তানি আদেশ বৃদ্ধির কারণে নয়।

তিনি বলেন, জুনে প্রবৃদ্ধি হলেও পুরো অর্থবছরে নিটওয়্যার রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়াই এর প্রধান কারণ।

ফজলে শামীম এহসান জানান, উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। শ্রমিকের মজুরি ৯ শতাংশ, সুতার দাম ১০ শতাংশ, রং ও রাসায়নিকের দাম ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়ছে না। ফলে অনেক কারখানা লোকসানে পড়েছে, কেউ কেউ ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

পোশাকের পাশাপাশি জুন মাসে অন্যান্য রপ্তানি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। পুরো অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি জুনে বেড়েছে ৭৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থবছর শেষে এ খাতের আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮৩ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া হোম টেক্সটাইল খাতে ৫৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ৪৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং কৃষিপণ্যে ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারের অবস্থান ধরে রেখেছে। বিদায়ী অর্থবছরে দেশটিতে ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে জার্মানি ও যুক্তরাজ্য।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রপ্তানি গন্তব্যের প্রতিটিতেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার এবং নতুন বাজার ও নতুন পণ্য নিয়ে কাজ করার ফলেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ইপিবি আশা করছে, জুন মাসের এই গতি এবং বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত