রোমাঞ্চ নাকি একপেশে

আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

ফিফা র‌্যাংকিংয়ে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আর্জেন্টিনা যেখানে বিশ্ব ফুটবলের ২ নম্বর দল, সেখানে কেপ ভার্দের অবস্থান ৬৪। ক্রীড়া তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘অপ্টা’র সুপার কম্পিউটার হিসাব কষে জানাচ্ছে ম্যাচে ৯০ মিনিটে মেসিদের জয়ের সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ আর আফ্রিকার দলটির মাত্র ৬ শতাংশ। তবে এই শুকনো পরিসংখ্যানকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট জোসে মারিয়া নেভেস। তার হুঙ্কার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে তার দেশের ফুটবলাররা মাঠের ভেতর এক ইঞ্চি জমিও ছাড় দেবে না।

অবশ্য মাঠের লড়াইয়ের আগেই বিশ্বমঞ্চে এক অনবদ্য এবং অবিশ্বাস্য ‘জার্সি কূটনীতি’ প্রয়োগ করেছে কেপ ভার্দে। একদিকে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় যাওয়ার হুঙ্কার, অন্যদিকে সম্প্রীতির অনন্য বার্তা। ম্যাচ শুরুর আগেই সম্মান জ্ঞাপনের জন্য লিওনেল মেসির হাতে নিজেদের দেশের একটি ১০ নম্বর জার্সি তুলে দেবে কেপ ভার্দে, যার পেছনে লেখা থাকবে মেসির নাম। দেশটির শীর্ষ নেতার প্রতি শব্দে জুড়েই রয়েছে মেসির প্রতি শ্রদ্ধা, আবার একই সঙ্গে রয়েছে ম্যাচ জেতার তীব্র তাড়না।

‘আমার মনে হয় কেপ ভার্দে এই ম্যাচ জিতবে ১-০ গোলে। যেহেতু আমাদের ওপর প্রত্যাশার চাপ খুব একটা বেশি নেই সবার, তাই জয়ের জন্য পুরোপুরি ঝাঁপাব। আমাদের জেতার সম্ভাবনা রয়েছে’, বলেছেন কেপ প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস।

ম্যাচটি হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির শহর মায়ামিতে। চলতি বিশ্বকাপে স্বপ্নের ফর্মে আছেন গত বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা অধিনায়ক; মাত্র ৩ ম্যাচে ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন ৬ গোল! নকআউটের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এই গোলমেশিনকে আটকানোর গুরুদায়িত্ব যার কাঁধে, তিনি কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার রবার্তো পিকো লোপেস। আর এই কঠিন পরীক্ষায় নিজের ছেলের ওপর শতভাগ বাজি ধরেছেন তার মা। আত্মবিশ্বাসী মায়ের ভাষায়, ‘মেসির মুখোমুখি হওয়াটাও দারুণ উপভোগ করবে। ও সবসময়ই ভীষণ শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী, চাপের মুখেও খুব ভালো খেলতে পারে। ও খেলায় এতটাই মনোযোগী থাকে যে, মাঠের বাইরের কোনো চাপই ওকে ছুঁতে পারে না।’

কাগজে-কলমে কেপ ভার্দে অনেক পিছিয়ে থাকলেও আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির মাথায় ঘুরছে অন্য এক অতীত ইতিহাস। আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৭১ র‌্যাংকিংয়ে থাকা দলের (পোল্যান্ড) কাছে হেরেছিল। তাছাড়া, চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে ধাক্কা খাওয়ার জলজ্যান্ত অভিজ্ঞতা তো আছেই। তাই এবার আর কোনো ‘পচা শামুকে’ পা কাটাতে চান না তিনি। ম্যাচের আগে সংবাদমাধ্যমকে সতর্ক করে স্কালোনি বলেন, ‘কেপ ভার্দে যেভাবে যোগ্যতা অর্জন করেছে, তাতে আমি বিন্দুমাত্র বিস্মিত নই। উরুগুয়ে কিংবা স্পেনের মতো প্রতিপক্ষকে ওরা আটকে দিয়েছে। ওরা অত্যন্ত শক্ত দল এবং আমাদের জীবনও কঠিন করে তুলবে।’

সংবাদমাধ্যম ও প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে কানসাসের প্র্যাকটিসে পনেরো মিনিটের উন্মুক্ত সেশনে এক অভিনব চাল চালেন স্কালোনি। প্রথম একাদশ আড়াল করতে তিনি ১১ জন নয়, বরং ১৩ জন ফুটবলারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রথম দলের জার্সি! যার মধ্যে ১০ জন নিশ্চিত হলেও বাকি ৩ জন মূলত প্রথম দলে ঢোকার লড়াইয়ে আছেন।

প্র্যাকটিসে প্রথম দলের জার্সি পাওয়া ফুটবলাররা হলেন মোলিনা, রোমেরো, ওতামেন্দি, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, মেদিনা, ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাকঅ্যালিস্টার, থিয়াগো আলমাদা, মেসি এবং হুলিয়ান আলভারেজ। চোট কাটিয়ে প্র্যাকটিসে ফিরেছেন ‘কুটি’ রোমেরো। মেডিকেল স্টাফরা সবুজ সংকেত দিলেও স্কালোনি এখনো ডিফেন্সে ও আক্রমণভাগে প্রথম একাদশ চূড়ান্ত করতে মধুর সমস্যায় ভুগছেন।

এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীদের আলাদা নজর থাকবে দুই দলের গোলপোস্টের নিচে। আর্জেন্টিনার আছেন টাইব্রেকার স্পেশালিস্ট ও বিশ্বসেরা গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজ, আর কেপ ভার্দের দুর্গ সামলাচ্ছেন অভিজ্ঞ ভোজিনহা, যার এই বিশ্বকাপেই এক ম্যাচে ৭ সেভের রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন। নকআউটের ম্যাচে যেকোনো মুহূর্তেই খেলা মোড় নিতে পারে ভিন্ন দিকে। কোনোভাবে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচ অমীমাংসিত থেকে যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তবে এই দুই অতিমানবীয় গোলরক্ষকের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করে দেবে ম্যাচের ভাগ্য। পেনাল্টি শুটআউটের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে মার্তিনেজের চাতুর্য নাকি ভোজিনহার দেয়াল কার হাত ধরে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত হবে, তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

এই লড়াইয়ের পেছনে কাজ করছে তিনশ বছর পুরনো এক ঐতিহাসিক সংযোগও। আর্জেন্টিনার লকার রুমে যে ‘ভার্জিন অব লুজান’ (কুমারী মারিয়া) মূর্তিটি ফুটবলারদের প্রতিটি ম্যাচের আগে মানসিক শক্তি জোগায়, ১৭ শতকে সেই মূর্তির প্রথম ঐতিহাসিক তত্ত্বাবধায়ক ও আজীবন সেবক ছিলেন ‘নেগ্রো ম্যানুয়েল’ নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি। আর ইতিহাস বলছে, সেই ম্যানুয়েলের জন্ম হয়েছিল আজকের এই কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অঞ্চলেই!

ইতিহাসের সেই অদৃশ্য সুতো আর মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামের বর্তমান লড়াই সব মিলিয়ে শুক্রবারের রাতটি হতে পরে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের সাক্ষী। আগের রাতে কঙ্গো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করে যেভাবে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, ফুটবল ভক্তরা তেমন কিছুই দেখতে চান কেপ ভার্দের কাছ থেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত