এল নিনোর শেষ ম্যাচ আজ!

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

কানসাস সিটিতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের দুই বিপরীত মেরু। একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার শৈল্পিক ফুটবল, পাসিংয়ের নিখুঁত বুনন আর চোখ ধাঁধানো আক্রমণ; অন্যদিকে আফ্রিকার বুক চিরে আসা শারীরিক ফুটবল, গতি আর ইস্পাত-দৃঢ় রক্ষণভাগ। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের সমাপনী ম্যাচে কলম্বিয়া ও ঘানার এই দ্বৈরথ কেবল পরের রাউন্ডে যাওয়ার লড়াই নয়, এটি আসলে দুই ভিন্ন ঘরানার ফুটবল দর্শনের সংঘাত। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগকে নিয়ে অপরাজিত থাকা লাতিন পরাশক্তিরা যখন আরও একটি দাপুটে জয়ের খোঁজে, তখন আফ্রিকার ‘ব্ল্যাক স্টার’রা তৈরি করছে এক নিিদ্র প্রাচীর; যার লক্ষ্য কানসাস সিটিতে বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটানো।

বিশ্বমঞ্চে এর আগে কখনো মুখোমুখি হয়নি এই দুই দল। তবে অতীতের পরিসংখ্যান লাতিন আমেরিকানদের পক্ষেই কথা বলছে। বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর বিপক্ষে খেলা নিজেদের শেষ চার ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে কলম্বিয়া। বিপরীতে, বিশ্বমঞ্চের নকআউট পর্বে দক্ষিণ আমেরিকান প্রতিপক্ষের সামনে আসলেই যেন পা হড়কায় ঘানার। ২০০৬ সালে ব্রাজিলের কাছে এবং ২০১০ সালের সেই বিখ্যাত কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা। তবে কলম্বিয়ার জন্য আফ্রিকান জুজুও আছে; ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল ‘লস ক্যাফেতেরোস’রা।

চলতি আসরে নেস্তর লরেঞ্জোর অধীনে কলম্বিয়া গ্রুপ ‘কে’-তে ছিল একেবারেই নিখুঁত ও অপরাজেয়। উজবেকিস্তান ও ডিআর কঙ্গোকে উড়িয়ে দেওয়ার পর শক্তিশালী পর্তুগালের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা নকআউটে এসেছে। পুরো গ্রুপ পর্বে মাত্র ১টি গোল হজম করা কলম্বিয়া রক্ষণ ও আক্রমণের এক ভয়ংকর ভারসাম্য তৈরি করেছে। অন্যদিকে নানা মাঠ ও মাঠের বাইরের নাটকীয়তা পেরিয়ে এসেছে ঘানা। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক দুই মাস আগে পর্তুগিজ মাস্টারমাইন্ড কার্লোস কুইরোজের আচমকা নিয়োগ, তারকা ফুটবলার মোহাম্মদ কুদুসের চোট এবং অধিনায়ক থমাস পার্টের আইনি জটিলতা। সব সামলে গ্রুপ ‘এল’-এর তৃতীয় সেরা দল হিসেবে তারা নকআউটে পা রেখেছে। সহ-স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সঙ্গে ড্র এবং পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, খাদের কিনারা থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়।

তবে এই ম্যাচের আড়ালে একটি মৃদু অদৃশ্য স্রোতও বইছে, যার কেন্দ্রে আছেন ঘানার বর্তমান কোচ কুইরোজ। এটি তার কোচিং ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। কাকতালীয়ভাবে, এই কলম্বিয়া দলটা তার ভালোভাবেই চেনা, কারণ ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত হামেস রদ্রিগেজদের প্রধান কোচ ছিলেন তিনিই। উরুগুয়ে ও ইকুয়েডরের কাছে বড় ব্যবধানে হেরে সেবার চাকরি খোয়াতে হলেও, আজ সেই পুরনো কোচের ক্ষুরধার মস্তিষ্কই হতে পারে ঘানার প্রধান অস্ত্র। মাঝমাঠের জেনারেল থমাস পার্টেকে দিয়ে কলম্বিয়ার রিচার্ড রিয়োসের সৃজনশীলতা আটকে দেওয়ার যে ছক কুইরোজ কষছেন, তা ভাঙার দায়িত্ব থাকবে ৩৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ জাদুকর হামেস রদ্রিগেজ ও চোট কাটিয়ে ফেরা স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজের ওপর।

বল পজেশনে মাত্র ৩৬% গড় নিয়ে নকআউটে আসা ঘানা মূলত কাউন্টার অ্যাটাক ও সেট-পিসের ওপর ভরসা করে আছে, যেখানে তাদের শেষ ১০টি গোলের প্রতিটিই এসেছে দ্বিতীয়ার্ধে। কুইরোজ তার ঘানাকে নিয়ে ২০১০ সালের মতো আরেকটি ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনালে চোখ রাখছেন। তবে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিক ছন্দ আর লরেঞ্জোর অপরাজেয় বাহিনীর প্রাচীর ভেঙে ‘ব্ল্যাক স্টার’রা কোনো অঘটন ঘটাতে পারে, নাকি কলম্বিয়া তাদের জয়রথ সচল রাখবে সেটি সময়ই বলে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত