প্রত্যাবর্তনের যে গল্পে সেনেগালের স্বপ্নভঙ্গ

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৭ এএম

পরাজয়ের ঠিক ৪ মিনিট আগে যখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে একটি দল, তখন চিরন্তন ফুটবলীয় ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রূপকথা লেখার সাহস কজন দেখায়? সিয়াটলের গ্যালারিতে যখন লায়ন্স অব তেরাঙ্গাদের জয়োল্লাস আর মাঠের ভেতর অধিনায়ক ইউরি তিলেমানস ও উইঙ্গার লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ডের মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় সেখানে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের বিদায়ঘণ্টা তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপিয়ান জায়ান্টরা যখন আগেই অঘটনের শিকার হয়ে ঘরের পথ ধরেছে, তখন রেড ডেভিলরাও যেন এগোচ্ছিল সেই পথেই। কিন্তু ফুটবল ভাগ্য সম্ভবত এই ম্যাচের জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে পিছিয়ে থাকা বেলজিয়াম মাত্র ৩ মিনিটের ঝড়ে সমতা ফিরিয়ে ম্যাচ নিল অতিরিক্ত সময়ে, আর ১২৫তম মিনিটের বিতর্কিত পেনাল্টিতে সেনেগালকে স্তব্ধ করে দিয়ে ৩-২ ব্যবধানে নিশ্চিত করল শেষ ষোলো।

ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্রনাট্য অবশ্য পুরোপুরি লিখেছিল সেনেগাল। সাদিও মানে এবং ইসমাইলা সারের গতি আর নিখুঁত রসায়নে শুরু থেকেই কোণঠাসা ছিল বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ। ম্যাচের ২৫ মিনিটে সারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে এলে নিখুঁত রিবাউন্ডে গোল করে সেনেগালকে এগিয়ে দেন হাবিব দিয়ারা। ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ৩২ মিনিটে মাঠে দর্শক ঢুকে পড়ায় খেলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে।

বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে উল্টো ৫১ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় রুডি গার্সিয়ার দল। মুসা নিয়াখাতের চোখ ধাঁধানো এক পাস বুক দিয়ে নামিয়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে ব্যবধান ২-০ করেন ইসমাইলা সার। এই গোলের মাধ্যমে ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলার পর প্রথম কোনো আফ্রিকান খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপে ৪টি গোল করার কীর্তি স্পর্শ করেন সার।

৩৫ বছরে পা দেওয়া কেভিন ডি ব্রুইনে মাঠজুড়ে আজ ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে, যার ফলে ৫৫ মিনিটেই তাকে তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ। তবে খেলার ভাগ্য বদল করে দেয় গার্সিয়ার দ্বিতীয়ার্ধের বদলি খেলোয়াড়রা। ৮৪ মিনিটে কোর্তোয়া নিশ্চিত গোল ঠেকানোয় লাইফলাইন পায় বেলজিয়াম। এর ঠিক দুই মিনিট পর, ৮৬ মিনিটে বদলি নামা রোমেলু লুকাকু থমাস মুনিয়েরের নিচু ক্রস থেকে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ২-১ করেন। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৮৯ মিনিটে সেই ট্রোসার্ডের নিখুঁত ভাসানো ক্রসে চিতা বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে বুলেট হেডারে সমতা (২-২) ফেরান অধিনায়ক তিলেমানস। কিছুক্ষণ আগের ঝগড়া ভুলে তখন পুরো দল মেতে ওঠে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের উল্লাসে।

ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে দুই দলই যেন ক্লান্ত বক্সারের মতো লড়ে যাচ্ছিল। যখন মনে হচ্ছিল টাইব্রেকারই একমাত্র নিয়তি, ঠিক তখনই ১২২তম মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। ডি-বক্সের ভেতর তিলেমানসকে সেনেগালের লামিনে কামারা আঘাত করলে মাঠের রেফারি সাইদ মার্টিনেজ প্রথমে পেনাল্টি দেননি। তবে ভিএআর পরীক্ষার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজলে সেনেগাল শিবিরে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মরক্কোর বিপক্ষে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস (আফকন) ফাইনালে পেনাল্টির প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে বিতর্কে জড়ানো সেনেগাল এবার মাঠ না ছাড়লেও, পেনাল্টি স্পটে শুয়ে পড়ে সময় নষ্ট করার এক নজিরবিহীন মানসিক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেন পাথে সিস।

দীর্ঘ নাটকীয়তা আর প্রতিবাদের ঝড় সামলে অবশেষে ১২৫তম মিনিটে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোল, পেনাল্টি থেকে বল জালের ওপরের কোনায় জড়িয়ে দেন তিলেমানস। নাটকীয়তার চরম পর্যায়ের প্রদর্শন শেষে বেলজিয়াম উঠে যায় শেষ ষোলোতে।

বিদায়ের বেদনায় নীল সেনেগাল কোচ পাপে থিয়াউ ম্যাচ শেষে বলেন, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে, ফুটবল সত্যিই এক নিষ্ঠুর খেলা।’ আর খাদের কিনারা থেকে ফেরা বেলজিয়াম বস রুডি গার্সিয়া এই জয়কে বার্সেলোনার ২০১৭ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘রেমন্টাদা’ বা মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেন। পিএসজির বিপক্ষে প্রথম লেগে ৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় লেগে ৬-১ গোলে জিতে বার্সেলোনা যেভাবে ফুটবল ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছিল, গার্সিয়ার চোখে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা বেলজিয়ামের এই জয়ও ছিল ঠিক তেমনই এক অসম্ভবের দেয়াল ভাঙার গল্প। তৃপ্তির হাসি হেসে তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ শেষ বাঁশি না বাজবে, ফুটবলে সবকিছুই সম্ভব।’

কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী ৭ জুলাই এবার সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে খেলবে বেলজিয়াম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত