মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমশক্তির উর্বর জমিন ছিল বাংলাদেশের, তা দূর অতীতের ইতিহাস নয়। সেখানে বাংলাদেশি দক্ষ-অদক্ষ কর্মীদের কদর কিংবা চাহিদা ছিল ভিন্নমাত্রায় এবং ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গভীরতা যে ছিল এর পেছনের মুখ্য কারণ, তা অনস্বীকার্য। বন্ধুত্বের সম্পর্কের গভীরতায় ভাটা না পড়লেও উল্লেখিত দেশগুলোতে শ্রমবাজার আর আগের মতো নেই। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে দেখা দেয় বহুমাত্রিক সংকট, অস্থিরতা, আর্থিক টানাপড়েন। এর কমবেশি অভিঘাত লাগে এই অঞ্চলের সব কটি দেশের শ্রমবাজারেই। ভারত-শ্রীলঙ্কার শ্রমবাজার ওইসব দেশে
বিস্তৃত। কিন্তু এর পুনরুদ্ধারে ফের সবাই তৎপর হয়ে উঠেছে। বসে নেই বাংলাদেশও। গত এপ্রিলে দেশ রূপান্তরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেল ২ জুলাই দেশ রূপান্তরের আরেকটি প্রতিবেদনে।
বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার খুলতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কাজ করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তার মালয়েশিয়া সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে অনুরোধ জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে। এখন কাজ চলছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার খোলার। চলতি মাসেই প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ওমান যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৩২ মাস ধরে বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ রয়েছে ওমানের শ্রমবাজার। পুরনো বাজার পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নুতন বাজার সন্ধানের কোনো বিকল্প নেই বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি, আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার হচ্ছে প্রবাসী আয়। এই বাস্তবতায় প্রবাসী কর্মীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে আমরা অভিহিত করি। বিদায়ী অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭.০৩ শতাংশ এই বার্তা মিলেছে ২ জুলাই দেশ রূপান্তরেই।
গত অর্থবছরজুড়েই রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ছিল ইতিবাচক ধারা। এই ধারাবাহিকতায়ই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এও আমাদের অজানা নয়, বাংলাদেশি কর্মীরা প্রবাসে যেভাবে কাজ করেন অন্যরা সেভাবে করেন না। বাংলাদেশি কর্মীরা পরিশ্রমী এবং এ জন্যই নিয়োগদাতাদের পছন্দের অগ্রভাগে থাকেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমরা আশা করি, সরকারের নতুন উদ্যোগে ও শাণিত কূটনৈতিক তৎপরতায় বন্ধ শ্রমবাজারের দরজা উন্মুক্তের পাশাপাশি শ্রমশক্তি রপ্তানির পরিসর বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন বাজার সন্ধানের কূটনৈতিক তৎপরতাও করতে হবে জোরদার। প্রতিযোগিতার বাজারে দরকার দূরদর্শী কূটনীতি এবং সমভাবেই জরুরি সুনাম যাতে অক্ষুণœ থাকে সেদিকে মনোযোগ গভীর করা।
গত বছরের হিসাবে রেমিট্যান্সের প্রবাহে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও জুনে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটা নানা কারণে হতেই পারে, কিন্তু কারণগুলো আমলে নিয়ে পর্যবেক্ষণক্রমে পরিকল্পনা তৈরি করা চাই সেই নিরিখে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, শ্রমবাজার নিয়ে যখনই কোনো সম্ভাবনার আলো ছড়ায় তখনই কতিপয় জনশক্তি রপ্তানিকারক, মানবপাচারকারী অপতৎপরতা শুরু করে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পরে শ্রমবাজারে। এ জন্য আমাদের ক্ষতির চিত্রও কম স্ফীত হয়নি। এই চক্রের হীনস্বার্থপরতা ও প্রতারণার কারণে কত জীবনে, পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার ও জাতীয় অর্থনীতির পথ হয়েছে কণ্টকাকীর্ণ এর নজিরও আমাদের সামনে কম নেই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, নিয়মিত অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং আমাদের ক্ষেত্রে অতীতে তা-ই দৃশ্যমান হয়েছে ফিরে ফিরে। আরও মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে টেকসই করতে হলে একক অঞ্চলনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বহুমুখী শ্রমবাজার গড়ে তোলা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা এই বিষয়গুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি মহলকে অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে আমলে রাখার তাগিদ দিই। আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারের পথ মসৃণ করা সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।