২৮ বছর আগের হারের সেই স্মৃতি যেন এখনো তাড়া করে বেড়ায় প্যারাগুয়েকে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের তখনকার অধিনায়ক দিদিয়ের দেশম মাঠ ছেড়েছিলেন হোসে লুইস চিলাভার্টের জমাট রক্ষণ ভেঙে ১১৪ মিনিটের এক অন্তিম ‘গোল্ডেন গোল’-এ ম্যাচ জিতে। দীর্ঘ দুই যুগ পর সেই হিসাব চুকানোর মঞ্চ যখন আবার প্রস্তুত, তখন ফরাসিদের ডাগআউটে এবার কোচ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন সেই চেনা মুখ দিদিয়ের দেশম। তবে এবার ফরাসিদের অস্ত্রাগারে রয়েছে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের মতো এক নির্মম গোলমেশিন। সেই উড়তে থাকা ফরাসিদের রুখে দিয়ে পুরনো আক্ষেপের প্রতিশোধ নেওয়ার বড় দায়িত্বটা এবার প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের কাঁধে, যার সামনে একই সঙ্গে ম্যাচ জেতা আর নিজের বন্ধকী জার্সি ফেরত পাওয়ার এক আবেগঘন লড়াই। দুইয়ে মিলে মাঠের ভেতরের ফুটবলীয় উত্তাপ সব হিসাব-নিকাশকে ছাড়িয়ে যেতে বাধ্য।
প্যারাগুয়ের জন্য এই ফরাসি বাধা কাটানো যে মোটেও সহজ হবে না, তা দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস ঘাঁটলেও স্পষ্ট হয়। হেড-টু-হেড পরিসংখ্যানে এখনও ফ্রান্সের বিপক্ষে কোনো জয়ের মুখ দেখেনি দক্ষিণ আমেরিকান দলটি। দুই দলের আগের পাঁচটি লড়াইয়ের তিনটিতেই জিতেছে ফ্রান্স, আর বাকি দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। এই পাঁচ ম্যাচের মধ্যে বিশ্বমঞ্চের দেখাই রয়েছে দুটি। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে জুঁস ফন্তেইনের হ্যাটট্রিকে প্যারাগুয়েকে ৭-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল ফরাসিরা, আর দ্বিতীয় দেখাটি ছিল ১৯৯৮ সালের সেই ১১৪ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস নকআউট। এবার সেই জয়হীন খরা কাটানোর মিশন আলফারোর শিষ্যদের।
চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্স যেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। প্রথম চার ম্যাচের সবকটিতে জিতে তারা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ১৩ বার, যার মধ্যে ১২টি গোলই এসেছে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার ত্রিমুখী আক্রমণ থেকে। সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ফরাসিদের সাইড বেঞ্চের গভীরতা এতটাই যে, রাইয়ান শেরকি বা জঁ-ফিলিপ মাতেতাদের মতো খেলোয়াড়দেরও মাঠের বাইরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে মাঝমাঠের মাইকেল অলিস একাই করেছেন পাঁচটি অ্যাসিস্ট, যা এক টুর্নামেন্টে পেলের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ছোঁয়ার থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। অধিনায়ক এমবাপ্পেও ৬ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের শীর্ষ গোলদাতার তালিকায় নিজের নাম লিখিয়েছেন।
তবে এই দুর্দান্ত ফর্মের মধ্যেও নিজেদের মাটিতে ধরে রাখছেন ফরাসি কোচ দেশম। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, প্যারাগুয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার যোগ্যতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দেশম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘প্যারাগুয়ে যা অর্জন করেছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়। তারা খাঁটি দক্ষিণ আমেরিকান দল; শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দলে দারুণ মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। কোনো দলই বিশ্বকাপে এমনি এমনি এই পর্যায়ে পৌঁছায় না।’ ফরাসি উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলাও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ নিয়ে সমান সচেতন, ‘আমরা জানি ম্যাচটি জটিল হবে। প্যারাগুয়ে নিচে নেমে ডিফেন্স করবে। তবে আমাদের আক্রমণভাগ একসঙ্গে খেলাটা উপভোগ করছে এবং আমরা তাদের ভাঙার পথ খুঁজে বের করব।’
২৮ বছর আগের সেই নকআউটের স্মৃতি যেখানে প্যারাগুয়ের মনে জ্বালানি জোগাচ্ছে, সেখানে এবার তাদের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল।