২০১৪ বিশ্বকাপে সালভাদরের সে রাতে নির্ধারিত সময়ের লড়াই শেষে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। যুক্তরাষ্ট্রের জালের সামনে একের পর এক ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল বেলজিয়ামের আক্রমণ, সে ঢেউ আটকে দেয় একটি পাহাড়-গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ড। একে একে ১৬টি সেভ, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা আজও আলোচিত হয়ে আছে। কিন্তু সে দিন একজনের বীরত্ব যথেষ্ট ছিল না। যদিও শেষ মুহূর্তে তাদের মরিয়া প্রচেষ্টা প্রতিপক্ষ শিবিরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। তবে প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখতে পারেনি মার্কিনিরা, শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের ২-১ গোলে হেরে।
সে ক্ষত আজও দগদগে যুক্তরাষ্ট্রের বুকে। এক যুগ পর সিয়াটলের মাটিতে ইতিহাস যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে তাদের, এবার প্রতিশোধের লড়াই। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিটের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা। এক পাশে যুক্তরাষ্ট্র, ঘরের মাঠে দর্শকদের গর্জনকে সঙ্গী করে ইতিহাস বদলে দিতে মরিয়া। অন্য পাশে বেলজিয়াম, যারা কিছুদিন আগেই সেনেগালের বিপক্ষে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে, দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছে। পরিসংখ্যানে অবশ্য এগিয়ে দ্য রেড ডেভিলসরা। ৭ বারের মুখোমুখি দেখায় বেলজিয়ামের জয় ৬টি, যুক্তরাষ্ট্র জিতেছে ১টি ম্যাচ। যদিও এবারের লড়াইয়ে দুই দলই সমান অবস্থায় আছে বলে মনে করছেন বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার ডোডি লুকেবাকি, ‘এখন তারা পুরোই অন্যরকম একটি দল। বিশ্বকাপে সব কিছুই আলাদা। তারা দর্শক-সমর্থনও পাবে। তাই লড়াইটা হবে ৫০-৫০।’
ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে দারুণ ছন্দে আছে যুক্তরাষ্ট্র। গ্রুপপর্বে প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর রাউন্ড অব ৩২-এ বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়, সেটাও আবার শেষ ৩৬ মিনিট ১০ জনের দল নিয়ে খেলে। মৌরিসিও পচেত্তিনোর শিষ্যদের নিয়ে প্রত্যাশা এখন আকাশছোঁয়া। সেই জয়ের জন্য অবশ্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে দলটিকে। প্রথমার্ধে গোল করার পর দ্বিতীয়ার্ধে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন। এ ম্যাচে তার অনুপস্থিতি ভোগাতে পারে স্বাগতিকদের। এদিকে বেলজিয়াম এখনো নিজেদের পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারেনি। সেনেগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে এ পর্যন্ত এসেছে তারা। এবারের বিশ্বকাপ কেভিন ডে ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকু, থিবো কোর্তোয়ারদের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর শেষ অধ্যায় হতে পারে।
ডে ব্রুইনে-কোর্তোয়ারদের মতো ২০১৪ বিশ্বকাপে খেলা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ফুটবলারও এবার লড়াইয়ে নামবেন। পাশাপাশি বসনিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর স্বাগতিকদের রক্ষণভাগ এখন বেশ আত্মবিশ্বাসী। ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্র শিবিরে স্পষ্ট আশাবাদের সুর। ডিফেন্ডার সার্জিনো ডেস্ট বলেন, ‘আশা করি আমরা এই ম্যাচ জিতব এবং টুর্নামেন্টে আরও এগিয়ে যাব। কারণ আমাদের দলে দারুণ কিছু খেলোয়াড় আছে।’ দলীয় আত্মবিশ্বাস আর সমর্থকদের সমর্থন নিয়েও আশাবাদী তিনি, ‘আমরা সত্যিই ভালো খেলছি এবং সবাই খুবই অনুপ্রাণিত। গোটা দেশ বিশ্বাস করছে (জয়), সমর্থকরা সমর্থন দিচ্ছে।’ তবে প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার ভুল করছেন না ডেস্ট, ‘যদিও তারা এই টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক নয়, কিন্তু আমরা জানি তাদের কতটা যোগ্যতা আছে।’
আরেক ডিফেন্ডার টিম রিমের কণ্ঠে ভিন্ন সুর, ‘এখন আমরা এসব নিয়ে ভাবছি না। আমরা ম্যাচ খেলা এবং ভালো পারফরম্যান্স করতে পারার ব্যাপারে মনোযোগ দিচ্ছি। তবে আমরা জানি, দেশের ওপর এবং নতুন প্রজন্ম ও সমর্থকদের ওপর আমাদের প্রভাব পড়ছে। যখন দল ভিন্ন ভিন্নভাবে জিততে পারে, সেটা মানসিকভাবে আপনাকে শক্তি দেয়। সব সময় ম্যাচ সুন্দর হবে না, সব কিছু আপনার পক্ষে যাবে না, কিন্তু ম্যাচ শেষ করার (জিতে) পথ খুঁজে নিতে হয়।’
বেলজিয়াম দলে চলছে আত্মবিশ্বাস আর সতর্কতার টানাপড়েন। সেনেগাল-বিপর্যয় থেকে ফেরার রোমাঞ্চ এখনো কাটেনি ডিফেন্ডার ম্যাক্সিম দে কুইপারের মনে, ‘সেনেগাল ম্যাচের পর সব আবেগ এখন শান্ত হয়েছে। শুরুতে এটা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল, কারণ এটাই ছিল এমন অভিজ্ঞতা যা আমি আগে কখনো পাইনি।’ যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সতর্কবার্তা তার কণ্ঠে, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ্বকাপে অনেক উন্নতি করেছে। তাদের দলে অনেক মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে। আমাদের মাঠে সাহস দেখাতে হবে। ৮০ হাজার দর্শকের সামনে খেলতে গেলে নিজের খেলা ধরে রাখতে হয়। আমরা এই বিশ্বকাপে অনেকবার অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। তাই আমরা এখনো আরও কিছু অর্জনের জন্য ক্ষুধার্ত। অন্তত আরও এক রাউন্ড পার হতে পারলে অনেক বেশি সন্তুষ্টি আসবে।’