৩
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলোকে শুধু একটি ম্যাচ বললে ভুল হবে। স্পেন ও পর্তুগালের লড়াই ঠিক তেমনই। একই উপদ্বীপের দুই প্রতিবেশী, দুই ফুটবল পরাশক্তি, দুই ভিন্ন দর্শনের মুখোমুখি সংঘর্ষ। এমন ম্যাচে পরিসংখ্যান, র্যাংকিং কিংবা অতীতের সাফল্য খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় মানসিক দৃঢ়তা, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত এবং সুযোগ কাজে লাগানোর সামর্থ্য।
স্পেনকে দেখলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো বলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ। তারা প্রতিপক্ষকে দৌড় করিয়ে ক্লান্ত করে, ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে এবং সঠিক মুহূর্তে আঘাত হানে। মাঝমাঠে তাদের পাসিংয়ের গতি এবং অবস্থান বদলের দক্ষতা অসাধারণ। বল যতক্ষণ তাদের দখলে থাকবে, ততক্ষণ প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাসও কমতে থাকবে। এটাই স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অন্যদিকে পর্তুগাল এখন আর শুধু একজন তারকার দল নয়। গত কয়েক বছরে তারা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়ে তুলেছে, যেখানে প্রতিটি বিভাগে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। রক্ষণ থেকে আক্রমণ পর্যন্ত সবাই দায়িত্ব নিয়ে খেলছে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, উইং দিয়ে গতি তৈরি এবং মাঝমাঠের সৃজনশীলতা তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আমার মতে, এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে মাঝমাঠে। যে দল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করবে, সেই দল ম্যাচের ছন্দও নিয়ন্ত্রণ করবে। স্পেন যদি নিজেদের স্বাভাবিক পাসিং ফুটবল খেলতে পারে, তাহলে পর্তুগালকে দীর্ঘ সময় রক্ষণে থাকতে হতে পারে। আবার পর্তুগাল যদি বল কেড়ে দ্রুত আক্রমণে যেতে পারে, তাহলে স্পেনের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে।
নকআউট ম্যাচে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ধৈর্য। অনেক সময় দর্শকরা দ্রুত গোল দেখতে চান। কিন্তু এমন ম্যাচে দুই দলই শুরুতে ঝুঁকি কম নেয়। কারণ একটি ভুলই পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই প্রথম ২০ থেকে ২৫ মিনিট হতে পারে একে অপরকে বোঝার সময়। এরপরই ম্যাচের গতি বাড়বে।
স্পেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সুযোগ তৈরি করার পর সেটিকে গোলে পরিণত করা। বলের দখল বেশি থাকলেই ম্যাচ জেতা যায় না। গোল করতে না পারলে সেই আধিপত্যের মূল্য থাকে না। অপরদিকে পর্তুগালের সামনে সুযোগ কম আসতে পারে, কিন্তু সেই অল্প সুযোগই কাজে লাগাতে হবে। বড় দলগুলোর লড়াইয়ে একটি মুহূর্তই অনেক সময় সবকিছু বদলে দেয়।
রক্ষণভাগের ভুলও এই ম্যাচে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা থ্রো-ইন, এসব সেট-পিসের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। কারণ খোলা খেলায় যখন দুই দলই একে অপরকে আটকে রাখে, তখন স্থির বল থেকেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়। একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমি সব সময় বিশ্বাস করি, নকআউট ম্যাচে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি মানসিক শক্তি সবচেয়ে বড় বিষয়। চাপের মধ্যে কে শান্ত থাকতে পারে, কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং কে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রাখতে পারে, এসবই নির্ধারণ করে জয়-পরাজয়।
আরেকটি বিষয় হলো বেঞ্চের শক্তি। আধুনিক ফুটবলে শুধু শুরুর একাদশ দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা খেলোয়াড়রাও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তাই দুই কোচের কৌশল এবং পরিবর্তনের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দর্শকদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ। দুই দলের ফুটবল দর্শন আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই জয়। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জায়গাও ছেড়ে দিতে চাইবে না। তাই কঠিন ট্যাকল, দ্রুত আক্রমণ, দারুণ গোলরক্ষণের পাশাপাশি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনা থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্পেন-পর্তুগাল দ্বৈরথ বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং কৌশল, সাহস, ধৈর্য এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অসাধারণ পরীক্ষা।