ব্যাংকিং খাতে যখন চরম আস্থার সংকট, ব্যাংকগুলো যখন খেলাপি ঋণে জর্জরিত এবং আমানতকারীদের উদ্বেগ, তখন একটি ব্যাংক কীভাবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ব্র্যাক ব্যাংক বলছে এর উত্তর লুকিয়ে আছে করপোরেট সুশাসন, কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনিষ্ঠ পরিচালনায়। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তিতে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন ব্যাংকটির পথচলা, অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কেন তারা নিজেদের দেশের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক মনে করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম।
দেশ রূপান্তর : ২৫ বছরের যাত্রায় ব্র্যাক ব্যাংকের বড় অর্জন কী?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন। ২৫ বছরে ২০ লাখের বেশি সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছি, যা এক কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের সেবা দেশের ২ হাজার ৩০০টিরও বেশি লোকেশনে পৌঁছে গেছে। ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে। রিটেইল পোর্টফোলিও ৫২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ এখন ৮ কোটির বেশি মানুষকে আর্থিক সেবা দিচ্ছে।
করপোরেট ব্যাংকিংয়েও আমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছি। ‘কর্পনেট’ প্ল্যাটফর্মে প্রতি মাসে ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। আমাদের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী মূলধন ও বৈদেশিক মুদ্রা সক্ষমতার কারণে দেশের ইতিহাসে একক ব্যাংক হিসেবে জাহাজ ব্যবসায় সর্বোচ্চ প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নও করেছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি সফল ব্যাংক হওয়া নয়; বরং দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংক এবং ভবিষ্যতে দেশীয় মালিকানাধীন প্রথম বহুজাতিক ব্যাংকে পরিণত হওয়া।
দেশ রূপান্তর : দেশে একটি নিরাপদ ব্যাংক হয়ে উঠতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো কী?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : এখন ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় মূলধনের নাম ‘আস্থা’। এটি গড়ে ওঠে সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা, আইন মেনে পরিচালনা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। একটি ব্যাংকের নিরাপত্তা মূল্যায়নে প্রথমেই দেখতে হবে তার স্পন্সরদের মান, পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা ও করপোরেট সুশাসন। ব্র্যাক ব্যাংকের বড় শক্তি হলো শক্তিশালী সুশাসনের সংস্কৃতি এবং স্বাধীন পরিচালনা কাঠামো। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাক ব্যাংকই দেশের একমাত্র ব্যাংক, যারা একই সঙ্গে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ও মুডিস থেকে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং পেয়েছে। তৃতীয়ত, সম্পদের গুণগত মান। ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি হলেও ব্র্যাক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।
এ ছাড়া তারল্য, মূলধন, মুনাফা ও আমানত প্রবৃদ্ধির মতো সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও মাত্র ৬৩ শতাংশ, মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। একই বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বা ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
দেশ রূপান্তর : দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : এক কথায় করপোরেট সুশাসন। সুশাসন নিশ্চিত হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীর স্বার্থরক্ষা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। সুশাসন আস্থা তৈরি করে, আস্থা নতুন গ্রাহক ও বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করে, আর সেই আস্থাই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে।
দেশ রূপান্তর : দ্রুত আমানত বাড়লে অনেক সময় খারাপ ঋণও বাড়ে। এ ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : আমাদের কাছে আমানতের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা কোনো একক খাত বা কয়েকজন বড় ঋণগ্রহীতার ওপর নির্ভরশীল নই। করপোরেট, কমার্শিয়াল, এসএমই, রিটেইল ও কৃষি সব খাতে বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও তৈরি করেছি। ফলে ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই ছড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রতিটি ঋণ কঠোর মূল্যায়ন, শক্তিশালী আন্ডাররাইটিং ও নিয়মিত পোর্টফোলিও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে অনুমোদন করা হয়। ফলে আমানত বৃদ্ধি ও সম্পদের গুণগত মান দুটিকেই একে-অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখি।
দেশ রূপান্তর : ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ যখন সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, তখন ব্র্যাক ব্যাংক কীভাবে সম্পদের মান ধরে রেখেছে?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : কারণ আমরা কখনোই নীতিমালা থেকে সরে আসিনি। বাজারে অনেক সময় এমন সুযোগ আসে, যা স্বল্পমেয়াদে বেশি মুনাফা এনে দিতে পারে। কিন্তু সেটি যদি আমাদের ঝুঁকি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেই ব্যবসায় যাই না। হয়তো এতে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের গুণগত মান অক্ষুণœ থাকে। একটি ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু মুনাফা করা নয়; বরং সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
দেশ রূপান্তর : নিরাপদ ব্যাংকিংয়ের জন্য ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব কতটা?
তারেক রেফাত উল্লাহ খান : বর্তমান সময়ে সাইবার নিরাপত্তা ছাড়া কোনো ব্যাংককে নিরাপদ বলা যায় না। আমরা মাল্টি-ফ্যাক্টর
অথেনটিকেশনসহ বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। আমাদের নিজস্ব সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম রয়েছে, যারা ফিশিং, ম্যালওয়্যার কিংবা ডেটা ব্রিচের মতো যেকোনো হুমকিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পলিকল্পনাও রয়েছে।