রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-সংলগ্ন টানপাড়া ও জামতলা এলাকায় টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় যখন হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, তখন ছুটির দিনেও মাঠে নেমেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুজ্জামান খান।
শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকাল চারটার দিকে তিনি জামতলা জাহিদ ইকবাল চত্বরসহ টানপাড়া ও নিকুঞ্জ ১ এর আশপাশের জলাবদ্ধ এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের ভোগান্তির কথা শোনেন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
নুরুজ্জামান খানের সঙ্গে পরিদর্শনে ছিলেন ডিএনসিসি অঞ্চল-১-এর সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার সরকার, উপ-সহকারী প্রকৌশলী সজীব হাসান এবং কার্য-সহকারী আব্দুর রহমান। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক জৈষ্ঠ্য সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল, সংগঠনের অন্যতম নেতা মতিউর রহমান স্বপন, তাসবির ইকবালসহ সোসাইটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিদর্শনকালে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, ড্রেন, ম্যানহোল এবং পানি নিষ্কাশনের পথ ঘুরে দেখেন। কোথায় পানি জমে থাকছে, কোথায় পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং কোন কোন স্থানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে দ্রুত পানি অপসারণ সম্ভব হবে—এসব বিষয় কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেও তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে নিকুঞ্জ ১, টানপাড়া, জামতলা, পশ্চিমপাড়া এলাকার অনেক সড়ক হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। এতে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ রোগীদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কর্মজীবী মানুষের অনেকেই সময়মতো কর্মস্থলে যেতে পারেননি। শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনা ও যাতায়াতে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হলে নিম্নাঞ্চলগুলো দ্রুত পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে প্রতি বর্ষায় একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
জলাবদ্ধতার এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে বেশ কিছুদিন ধরেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি। সংগঠনটির উদ্যোগে এলাকায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন, ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক, সরেজমিন পরিদর্শনের ব্যবস্থা, ড্রেন ও ম্যানহোল পরিষ্কারের উদ্যোগ এবং এলাকাবাসীকে সচেতন করতে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চলতি বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ম্যানহোলগুলো পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এরপরও সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় অব্যাহত রাখা হয়েছে।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি শুধু স্থানীয় উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে। স্থানীয় বাস্তবতা, পানি প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিভিন্ন প্রস্তাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বনরূপা সুইচগেট থেকে বরুয়া ব্রিজ হয়ে বালু নদী পর্যন্ত খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে টানপাড়া, জামতলা, নিকুঞ্জ এবং আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিও দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছিল নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।
পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের কাছে তাদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা জানান, তাৎক্ষণিক পানি অপসারণের পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। নিয়মিত ড্রেন ও ম্যানহোল পরিষ্কার, পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ, খাল পুনঃখনন এবং আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
এলাকাবাসীর একটি বড় অংশের মতে, দুর্যোগের সময় জনপ্রতিনিধিদের মাঠে উপস্থিতি মানুষের প্রত্যাশার অংশ। তবে এদিন ছুটির দিনেও ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুজ্জামান খান তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে মানুষের দুর্ভোগ দেখেছেন, অভিযোগ শুনেছেন এবং সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিষয়টিকে তাঁরা ইতিবাচক ও জনবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক পানি অপসারণ নয়, বরং সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, খাল ও জলাধারের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা, নিয়মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, ডিএনসিসির চলমান উদ্যোগ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর খাল খনন কার্যক্রম এবং নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির ধারাবাহিক জনসম্পৃক্ত তৎপরতার সমন্বয়ে টানপাড়া ও জামতলার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার একটি টেকসই সমাধান বাস্তবায়িত হবে।
তাদের আশা, এই পরিদর্শন কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকবে না; বরং এর ধারাবাহিকতায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে আগামী বর্ষা মৌসুমে এ এলাকার মানুষকে আর একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে না হয়।