সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতোই এখন পুরো ওয়েব ঘেঁটে দেখা যাবে স্ক্রল করতে করতে। নতুন আইফোন অ্যাপ হাইপারটেক্সটিং এমন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চায়, যেখানে ফেসবুক বা এক্সের (পূর্ব টুইটার) মতো সহজেই ওয়েবসাইট, ব্লগ, সংবাদমাধ্যম ও ব্যক্তিগত ওয়েব পেজের কনটেন্ট দেখা যাবে।
অ্যাপটির নির্মাতা ক্যালেব হেইলি। তিনি প্রযুক্তি খাতে দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন উদ্যোক্তা। তার লক্ষ্য, ইন্টারনেটের সেই পুরোনো ধারণাকে ফিরিয়ে আনা, যেখানে প্রত্যেক ব্যবহারকারীর নিজস্ব একটি ওয়েব ঠিকানা থাকবে এবং তিনি নিজের মতো করে সেখানে লেখা, ছবি বা অন্যান্য কনটেন্ট প্রকাশ করবেন।
হেইলির মতে, ইন্টারনেটের শুরুতে মানুষের নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরির আগ্রহ ছিল। কিন্তু পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের ফলে নিজস্ব ওয়েবসাইটের বদলে সবাই সহজে ব্যবহারযোগ্য প্ল্যাটফর্মে চলে যায়।
তিনি বলেন, একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসে গেল। সেখানে একটি পেজ তৈরি করে পোস্ট করা ওয়েবসাইট তৈরি করার চেয়ে অনেক সহজ হয়ে উঠল। এরপর যা ঘটেছে, তা সবাই জানে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভিজ্ঞতায় উন্মুক্ত ওয়েব
হাইপারটেক্সটিংয়ের মূল ধারণা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত কাঠামো ব্যবহার করে পুরো উন্মুক্ত ওয়েবকে একটি ফিডে নিয়ে আসা। অ্যাপটিতে ব্যবহারকারীরা ব্যক্তি, ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম, ব্লগ, নিউজলেটারসহ বিভিন্ন উৎস অনুসরণ করতে পারবেন।
এরপর এসব উৎসের লেখা, নিবন্ধ, ভিডিও, পডকাস্ট ও অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো স্ক্রল করে দেখা যাবে।
তবে অ্যাপটির বিশেষত্ব হলো, এটি কোনো অ্যালগরিদমনির্ভর ফিড ব্যবহার করছে না। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর সামনে কী দেখানো হবে, তা কোনো গোপন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হবে না।
টুইটার থেকে অনুপ্রেরণা
হেইলি জানান, টুইটারের পরিবর্তন তাকে হাইপারটেক্সটিং তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তার মতে, একসময় টুইটার ছিল নতুন বিষয় খোঁজা ও তথ্য ভাগাভাগির একটি কার্যকর জায়গা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটি অ্যালগরিদমনির্ভর হয়ে ওঠে এবং আগের মতো ধারাবাহিক সময়ক্রমে পোস্ট দেখানো বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, টুইটারে লিংকের গুরুত্বও কমে গেছে, যা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা আরও খারাপ করেছে।
করোনাকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে ‘ডুমস্ক্রলিং’ বা নেতিবাচক কনটেন্ট অনবরত দেখার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। তখন হেইলি নিজের ফোন থেকে প্রায় সব সামাজিক অ্যাপ সরিয়ে দেন।
এরপর তিনি আবার পুরোনো আরএসএস নিউজ রিডার অ্যাপ ব্যবহার শুরু করেন। একই সময়ে তিনি এমন একটি প্রকল্প নিয়েও কাজ করছিলেন, যার মাধ্যমে আইফোন থেকেই সহজে ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে লেখা প্রকাশ করা যায়।
আরএসএসকে সহজভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা
হাইপারটেক্সটিংয়ের প্রযুক্তিগত ভিত্তিতে রয়েছে আরএসএস। এটি ওয়েবের একটি পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত প্রযুক্তি, যা ব্লগ, পডকাস্ট ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটের নতুন কনটেন্টের আপডেট সরবরাহ করে।
তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে আরএসএস জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ অধিকাংশ মানুষ আলাদা নিউজ রিডারে ফিড যোগ করার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো সহজ স্ক্রলযোগ্য অভিজ্ঞতাই বেশি পছন্দ করেন।
এর আগে গুগল নিজস্ব আরএসএস রিডার ‘গুগল রিডার’ চালু করলেও ২০১৩ সালে সেটি বন্ধ করে দেয়। এরপর আর কোনো আরএসএস প্ল্যাটফর্ম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি।
নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশের সুযোগ
হাইপারটেক্সটিং শুধু ওয়েব কনটেন্ট পড়ার সুযোগই দিচ্ছে না, ব্যবহারকারীদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে লেখা প্রকাশের সুবিধাও দিচ্ছে।
ব্যবহারকারীরা ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগ, ঘোস্ট নিউজলেটার বা হুগোর মতো ওপেন সোর্স স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট জেনারেটর ব্যবহার করে নিজেদের কনটেন্ট প্রকাশ করতে পারবেন। হাইপারটেক্সটিংয়ের নিজস্ব ‘হাইপারটেমপ্লেটস’ ব্যবস্থাও রয়েছে।
কোনো ব্যবহারকারী কোনো নিবন্ধ বা ওয়েবসাইট নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করলে সেটি মূল কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং একই বিষয় অনুসরণকারী অন্য ব্যবহারকারীদের ফিডে দেখা যাবে।
অ্যাপটিতে ‘এক্সপ্লোর’ নামে একটি বিভাগও রয়েছে, যেখানে ওয়েবের আলোচিত কনটেন্ট খুঁজে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া সাফারি ব্রাউজারের জন্য একটি এক্সটেনশন রয়েছে, যার মাধ্যমে ব্রাউজ করার সময় নতুন ওয়েবসাইট অনুসরণ তালিকায় যোগ করা যাবে।
ওয়েবকে আবার সামাজিক নেটওয়ার্ক হিসেবে দেখার চেষ্টা
হেইলির মতে, প্রযুক্তি জগতে অনেক সময় নতুন কিছু তৈরির নামে জটিলতা বাড়ানো হয়। তার পরীক্ষাটি হলো—পুরোনো ও কার্যকর প্রযুক্তিগুলোকে নতুনভাবে সহজ ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
তিনি বলেন, বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর পেছনে ছোটা বা নতুন বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করার বদলে আমার ধারণা হলো, সবচেয়ে বড় বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক নেটওয়ার্ক ইতোমধ্যেই আছে। সেটির নাম ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব।
হেইলির প্রতিষ্ঠান হার্ড ওয়ার্কস তৈরি করেছে হাইপারটেক্সটিং। অ্যাপটি বর্তমানে আইওএসে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সুবিধার জন্য প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন বা দৈনিক একটি স্পনসরড পোস্ট যুক্ত করে আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র: টেকক্রাঞ্চ