টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফসলের জমি তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় সবার উপরে রয়েছে সবজি ও আমনের বীজতলা। এতে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চাল উৎপাদনের মৌসুম হিসেবে পরিচিত বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় আমনের চাষাবাদে প্রভাব ফেলতে পারে । গত ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই)।
ডিএই-এর ফসলি জমি আক্রান্তের ওপর তৈরি করা প্রাথমিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১২টি জেলার ফসল এই হঠাৎ দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে। যার পরিমাণ ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টর। এসব জেলায় বর্তমানে ৫ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে নানা ধরনের ফসল রয়েছে। সে হিসেবে আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রাথমিক এই হিসেবটি করা হয়েছে গত ৬ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত অতিবৃষ্টিতে পানি বৃদ্ধির কারণে যেসব জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। এ ধরনের দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে পানি নেমে যাওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণের হিসাবে তুলে ধরে।
জানা গেছে, আক্রান্ত হওয়া জমিগুলোতে সবজি, আমনের বীজতলার পাশাপাশি আউশ ধানের চাষাবাদ, পান, আদা, হলুদ, ফলবাগান, পাট, মরিচ, কলাসহ নানা কৃষিপণ্য রয়েছে। আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর।
কৃষি বিভাগ বলছে, তালিকায় থাকা সবগুলো জেলাতেই আমনের বীজতলা ও সবজির জমি আক্রান্ত হয়েছে। আমনের যেসব বীজতলা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে সেসব এলাকায় বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে করে পানি নেমে গেলে আমনের চারার কোনো ঘাটতি না হয়। ঘাটতি হলে কৃষকের নানা ধরনের ভোগান্তি হবে। চারার দাম বেড়ে যেতে পারে এবং পর্যন্ত জোগান না থাকলে কৃষক আমন উৎপাদন থেকে সরে আসতে পারে।
এ ছাড়া যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও নওগাঁর মতো এলাকাগুলোয় প্রচুর পরিমাণে সবজির উৎপাদন হয়। এসব সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজারে এর একটা বড় প্রভাব পড়তে পারে। বেশিরভাগ সবজির দাম এখন অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে যেখানে সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যেতে পারে।
এই অবস্থায় আবারও গতকাল রবিবার দেশের ছয় বিভাগে অতিভারী বর্ষণের আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিভাগগুলো হলো, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট। যা আক্রান্ত জমি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এদিকে কৃষি ছাড়াও মৎস্য খাতে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। চট্টগ্রাম বিভাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও চিংড়ির ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। শুধু চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩২০টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
যেসব এলাকায় বন্যায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন, সেসব এলাকার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি শনিবার সকালে কুমিল্লায় কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, তালিকা করার পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। তিনি বলেন, এখন বোরো ধান কাটা শেষ। তারপরও যে আবার চারা লাগানো শুরু হয়েছে, সেটির বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু যে চারাগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে সেগুলো যদি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে তাহলে পচে যাবে। আমরা ধরে নিতে পারি যে চারা রোপণ হয়েছে তার ২৫ শতাংশ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। যে কারণে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে যেখানে যেখানে বীজ কিংবা চারা সংকট দেখা দেবে তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুতি নিয়েছি।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ জমি ডুবে গেছে এবং তা পুনরায় রোপণ করতে কী পরিমাণ চারা লাগবেএসব তথ্য সংগ্রহ করে প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি। উঁচু এলাকাতে চারা উৎপাদনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। হয়তো কৃষকের ঘরে বীজ ধান আর নাও থাকতে পারে, তাই আমরা চারাটি সরবরাহ করার চেষ্টা করব।