বানের পানি কমলেও রানুদের চোখের জল ঝরছেই

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৮ এএম

গত বৃহস্পতিবার রাতে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যখন হু হু করে পানি ঢুকছিল লোকালয়ে, তখনো রানু বেগম বোঝেননি প্রকৃতি তার জন্য কতটা নির্মম হতে যাচ্ছে। শুক্রবার রাতের তীব্র স্রোতে চোখের পলকে ধসে পড়ে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই-ছোট্ট কুঁড়েঘরটি। চার সদস্যের এই সংসারে অভাব যার নিত্যসঙ্গী, কিন্তু একটা ছাদ তো ছিল মাথার ওপর! এখন সেই ছাদটুকু হারিয়ে রানু বেগম প্রতিবেশীর কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। শুধু হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রানু বেগমের নয়, বন্যাকবলিত সাত জেলার অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, কারও জীবিকার অবলম্বন আবাদি জমি, কারও পুকুরের মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে। বন্যার পানি যত কমছে দৃশ্যমান হচ্ছে লোকসানের ক্ষতচিহ্ন। এদিকে কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

বান্দরবানে বাড়িঘরে ফিরছে মানুষ : ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে থাকা বান্দরবান জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পানি কমার সঙ্গে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। গতকাল সোমবার সকাল থেকে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানান, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার ম-ল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাত। তবে উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, পানি নেমে যাওয়ায় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এদিকে বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী বন্যার্তদের জন্য গতকাল দুপুর থেকে রান্না করা খাবার বিতরণ করছেন। এ ছাড়াও বিজিবি জেলার বিভিন্ন জায়গায় শুকনো খাবার বিতরণ করেছে।

রাঙ্গামাটিতে অনেক বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে : বৃষ্টি কমে আসায় রাঙ্গামাটির বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। গতকাল সকাল থেকে অনেক গ্রামের পানি নেমে গেছে। সবচেয়ে বেশি প্লাবিত বাঘাইছড়ির অধিকাংশ ইউনিয়নের পানি নেমে গেছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। তবে পশ্চিম লাইল্যাঘোনা ইউনিয়নে এখনো পানিবন্দি আছে দেড় শতাধিক পরিবার। জেলার বরকল ও জুরাছড়ির বন্যা পরিস্থিতিও উন্নতি হচ্ছে। বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের পানিও সম্পূর্ণ নেমে গেছে। তবে সেখানে বেশ কিছু বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

কাপ্তাই হ্রদে বেড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন : এদিকে টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদে বেড়েছে পানি। বর্তমানে রুলকার্ভের চেয়ে প্রায় ১০ ফুট পানি বেশি রয়েছে হ্রদে। এতে উৎপাদন বেড়েছে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। তিন দিনের ব্যবধানে ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে সবকয়টি ইউনিট সচল রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ২০৬ মেগাওয়াট, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। কেন্দ্রের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৪২ মেগাওয়াট।

হবিগঞ্জের ৩৫ গ্রাম ধ্বংসস্তূপ : হবিগঞ্জে উজানে বৃষ্টি কম হওয়ায় খোয়াই নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। তবে লস্করপুর, লামাতাসি আর পইল ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামে এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে কর্দমাক্ত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন শতশত নিঃস্ব মানুষ। তাদেরই একজন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার হাতিরথান গ্রামের রানু বেগম।

বানের পানিতে  তার গোঁজার একমাত্র ঠাঁইÑছোট্ট কুঁড়েঘরটি ভেঙে যায়। চার সদস্যের এই সংসারে অভাব যার নিত্যসঙ্গী, কিন্তু একটা ছাদ তো ছিল মাথার ওপর! এখন সেই ছাদটুকু হারিয়ে রানু বেগম আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর কাছে। ‘আমার ছেলেটা তিন বছর ধইরা বিছানায় পইড়া আছে, কোমরের হাড্ডিতে সমস্যা। বুড়া মাডাও অসুস্থ। নিজের ঘরটা যখন ভাইঙা পড়ল, মনে হইলো আমার দুনিয়াটাই শ্যাষ। সরকার যদি একটু না তাকায়, আমি এই অসুস্থ পরিবার লইয়া কই যামু?’ বলছিলেন রানু বেগম। হাতিরথান গ্রামে শুধু রানু বেগম নন, এমন আরও অনেকের আহাজারি শোনা যায়। ঘরহারা এই মানুষগুলোর এখন একটাই চাওয়া ত্রাণ নয়, বরং মাথা গোঁজার টেকসই পুনর্বাসন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ জানান, ‘কয়েক দিনের মধ্যেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পুনর্বাসন করা হবে।’ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মঈনুল হক জানান, বন্যায় হবিগঞ্জ, বানিয়াচং ও বাহুবল উপজেলায় ৬ হাজার ৪৪৫টি পরিবারের প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাড়ে ৭ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ২০ টন চাল, ২ লাখ টাকা ও ১ হাজার ৭২ প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি বাড়ছে : টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এতে শঙ্কিত হাওরপাড়ের মানুষ। সুনামগঞ্জ পাউবো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ছাতকে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করেছে। বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়কের প্রায় ১০০ মিটার অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ওই সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

জগন্নাথপুর উপজেলার বালিশ্রী সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ঢলের পানি কাতিয়া, অলইতলী, পূর্ব জালালপুরসহ অন্তত ২০টি গ্রামের প্রবেশ করেছে। নদীভাঙনের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর, বন্যার শঙ্কা : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি আবার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। লালমনিরহাটে গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করলেও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় নদীতে পানির চাপ বাড়ছে। এতে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা, ফসলি জমি ও সড়কে পানি জমে যায়।

গতকাল দুপুরে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ), কুশিয়ারা নদীর মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দায় (নেত্রকোনা) বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে। এ ছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।

অন্যদিকে বন্যা পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কন্ট্রোল রুম চালু করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগের মোবাইল নম্বর ০১৭৩৯-০০০২৯৩ ও সমন্বিত হটলাইন ১৬৯৯৯-এ যোগাযোগের নির্দেশ দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয় শাখা থেকে আদেশ জারি করা হয়।

১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল : বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল দুপুরে মন্ত্রণালয়ে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় গৃহীত স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রম সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। আদ-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ত্রুটিগুলো সংশোধনের দাবি করে আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষ পুনরায় হাসপাতাল পরিদর্শনের আবেদন করেছে। সরকার পরিদর্শন করে সন্তোষজনক মনে করলে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বিবেচনা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত