সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে ঢাকার বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা। জলাবদ্ধতায় জনজীবনে নেমে আসে নানামাত্রিক দুর্ভোগ। স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের অবাধ ব্যবহার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেই যেমন সড়কের ওপর বিকল যানবাহন পড়ে থাকতে দেখা যায়, তেমনি জমে থাকা পানিতে পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী ভাসতে দেখা যায়। অবাধ ব্যবহারের সুযোগে সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব প্লাস্টিক সামগ্রী প্রাথমিকভাবে ড্রেন ও নালার মুখ বন্ধ করে দেয়। ফলে বৃষ্টির পানি নামতে সময় লাগে। আবার পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী একপর্যায়ে পানির সঙ্গে ড্রেন, নালা, খালে পড়ে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সব পেরিয়ে প্লাস্টিক সামগ্রীগুলো চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে জমা হচ্ছে জলাশয়, নদী, এমনকি সমুদ্রের তলদেশে। এই অপচনশীল বর্জ্য নদীর তলদেশ ভরাট করে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে। জলজ প্রাণীর জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন কেবল ঢাকা শহরেই সাড়ে চার কোটি পলিথিন ব্যাগ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। যদিও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিনিয়ত রাস্তা পরিষ্কারের জন্য কর্মী নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। আর বাসাবাড়ির বর্জ্য প্রতিদিনই সংগ্রহ করে ল্যান্ডফিলে নিয়ে যায়।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আহমেদ তৌফিক ঢাকায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহারের সঙ্গে জলাবদ্ধতার সম্পর্ক নিয়ে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বর্ষায় মৌসুমি ফল বিক্রির সঙ্গে ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে যায়। ওই পলিথিনের বড় অংশ মাটিতে ফেলা হয়, যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে নালা হয়ে খাল, নদী ও ভূগর্ভে জমা হচ্ছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি বিবেচনায় বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে প্রাথমিকভাবে পলিথিনের ব্যবহার কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও বন্ধ হয়নি। আইনের প্রয়োগ না থাকায় দেশে পলিথিনের ব্যবহার ক্রমেই বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিন ব্যাগ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুসারে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশের একটি। ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এর ব্যবহার তিনগুণের বেশি বেড়েছে। ঢাকায় একবার ব্যবহারের পর এগুলোর ৮০ শতাংশ মাটিতে ফেলা হচ্ছে।
শুরুর দিকে কেবল পলিথিন ব্যাগ প্রচলিত হলেও এখন যুক্ত হয়েছে টিস্যু ব্যাগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিসু্যু ব্যাগ মূলত প্লাস্টিকই। প্লাস্টিকের মূল উপাদান পলিপ্রোপাইলিন অপচনশীল পদার্থের তৈরি পলিথিন ব্যাগ বা যেকোনো পণ্য বা মোড়ক পরিবেশের জন্য সমান ক্ষতিকর।
গত শনিবার রাতের বৃষ্টিতে রাজধানীজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গতকাল রবিবার দুপুরের দিকে খিলগাঁও মডেল কলেজের সামনের রাস্তায় ছিল হাঁটুপানি। কলেজসংলগ্ন ফুটপাতও ডুবে ছিল। সেখানে একজনকে দেখা গেল ম্যানহোলের মুখ থেকে পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী সরিয়ে স্তূপ আকারে জমা করছেন। রেজওয়ান নামের ওই ব্যক্তি জানালেন, তিনি ওই ফুটপাতে চা বিক্রি করেন। পানি জমে যাওয়ায় দোকান বন্ধ, আয়-রোজগার নেই। এখন পলিথিন কুড়াচ্ছেন, যাতে দ্রুত পানি চলে যেতে পারে। তার মতে, পলিথিন ও প্লাস্টিক সামগ্রী না থাকলে এ রকম বৃষ্টিতে এত জলাবদ্ধতা হতো না।
নিউমার্কেট এলাকায় সৃষ্টি হয় মারাত্মক জলাবদ্ধতা। পানি জমে থাকায় মার্কেটের প্রতিটা দোকানে পানি ঢুকে লাখ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতির সম্মুখীন হন ব্যবসায়ীরা। নিউমার্কেটের ট্রলি ব্যাগ ব্যবসায়ী হান্নান জানান, নিচতলায় দোকানগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় সকাল থেকে কোনো দোকান খুলতে পারেননি। কোনো ক্রেতাও নেই। তিনি জানান, কয়েক বছর থেকেই এই জলাবদ্ধতার তৈরি হচ্ছে। কোনো সমাধান মিলছে না। যতদিন পলিথিন থাকবে ততদিন সমাধান পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, মালিবাগ, শাহজাহানপুর মোড়, খিলগাঁও রেললাইন এলাকায় পানি ছিল হাঁটুর ওপরে পানি। দেখা যায় বাস, সিএনজি, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। এর মধ্যে অনেক যানবাহন বিকল হয়ে পড়ার কারণে তৈরি হয় যানজট। কথা হয় মোটরসাইকেল নিয়ে বিপাকে পড়া শাহিন হোসেনের সঙ্গে। তিনি জিসকা ফার্মায় এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। এই এলাকার জলাবদ্ধতার জন্য সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং প্লাস্টিক-পলিথিনকে দায়ী করেন তিনি। তিনি বলেন, মানুষের স্বভাব না বদলালে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।
রাজধানীতে প্রতিদিন যেসব পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল ফেলা হয় তা সংগ্রহ করে বিক্রি করা কিছু মানুষের পেশা হয়ে উঠেছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত দোকানগুলো ভাঙারি হিসেবে পরিচিত। কয়েকটি ভাঙারি দোকান ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানে শত শত কেজি প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন সামগ্রী মজুদ রয়েছে। কদমতলী থানার মোহাম্মদবাগ এলাকার ভাঙারি ক্রেতা আফজাল হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন হকারদের কাছ থেকে ৭৫ থেকে ৯০ কেজি প্লাস্টিক ও পলিথিন পণ্য কিনেন। হকাররা সেগুলো বৃষ্টির পর খাল, ড্রেন ও স্যুয়ারেজ থেকে কুড়িয়ে আনে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট। তার মতে, এগুলোই অনেক সময় পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। তিনি প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার কেজি প্লাস্টিক সামগ্রী রিসাক্লিংয়ের জন্য সরবরাহ করে থাকেন।
প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিনের মতো ফেলে দেওয়া বর্জ্য কীভাবে শহরের জলাবদ্ধতার সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে তা নিয়ে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে সংসদ সদস্যদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রাস্তা কিংবা ড্রেন পরিষ্কার করেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা এখন শুধু ড্রেনের সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্লাস্টিক বর্জ্যরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতার অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে খাল, ড্রেন ও জলাধার দখলমুক্ত করে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।’
এসব বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সম্পাদক সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, ‘প্লাস্টিকদূষণ-সংক্রান্ত কার্যকর বিধিমালা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প না থাকায় এর ব্যবহার কমানো যাচ্ছে না। তাই পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটপণ্যের ও তন্তুজাতীয় পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রণোদনা ও উৎসাহ প্রদানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে কোনো এলাকা অপরিষ্কার না থাকে।’ জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। ড্রেন ও খালে প্লাস্টিক, বোতল কিংবা পলিথিন ফেলা বন্ধ করতে হবে।’