চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’র নামে ‘মুক্তি বাণিজ্য’ চলছে। নতুন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে কারাগারের একটি চক্র আসামিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এসব অনিয়মে একজন ডেপুটি জেলার, পুলিশের বিশেষ শাখার কিছু কর্মকর্তা এবং কারারক্ষী জড়িত বলে সরকারি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আদালত থেকে জামিন-সংক্রান্ত কাগজপত্র কারাগারে আসার পরই শুরু হয় দেনদরবার। ‘মুক্তি বাণিজ্য’ চক্রের সদস্যদের চাহিদা পূরণ হলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট বন্দির মুক্তি মিলে। বিশেষ করে বিত্তশালী বন্দিদের টার্গেট করেই চলছে এই ‘মুক্তি বাণিজ্য’। এতে লেনদেন হয় ৫ লাখ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
‘কাগজপত্র যাচাই-বাছাই কিংবা ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের’ নামে বন্দিদের দিনভর জেল গেটে বসিয়ে রেখে কারা অভ্যন্তরে চলতে থাকে ‘সমঝোতা’। কারাবিধি অনুযায়ী জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার আইনি বিধান থাকলেও তা লঙ্ঘন করে কারা কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সরকারের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এই অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত থেকে জামিননামা কারাগারে আসার পর কারও ক্ষমতা নেই সংশ্লিষ্ট বন্দিকে আটকে এনএসআই, সিটিএসবি ও ডিএসবির ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। জামিনপ্রাপ্ত বন্দিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এখানো কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নেই।’
রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের নতুন কোনো মামলায় ‘গ্রেপ্তার’ না দেখানো এবং কারাগার থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য চক্রের সঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলাম শামীম জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ চক্রে তার সহযোগী হিসেবে আছেন কুমিল্লায় একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ফখরুল ইসলাম নামে এক আসামি এবং একজন কারারক্ষী। ওই কারারক্ষী ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলামের রানার হিসেবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্মরত। এ ছাড়া জেলগেট থেকে আসামিকে নতুন মামলায় আটক কিংবা গ্রেপ্তার বাণিজ্যের সঙ্গে কারাগার এলাকায় দায়িত্বে থাকা জেলা বিশেষ শাখার পুলিশ সদস্যরাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলাম শামীমের মোবাইল ফোনে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ও বিকেলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আসামিকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ডেপুটি জেলার তৌহিদুল নিজের দায়িত্ব পালন করছে শুধু।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি ফখরুল ইসলাম কুমিল্লা জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। ওই সময় কুমিল্লা জেলা কারাগারে কর্মরত ছিলেন ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইমলাম শামীম। স্থানান্তর ও বদলি হয়ে এসে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এসে তারা বন্দি ‘মুক্তি বাণিজ্য’ চালিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক মামলায় বন্দি কোনো আসামির জামিনের তথ্য জানার পর ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলাম শামীম তা জানিয়ে দেন ফখরুল ইসলামকে। জামিন পাওয়া বন্দির সঙ্গে নতুন মামলায় না জড়ানোর বিষয়ে টাকা লেনদেনের বিষয়ে দেনদরবার করেন ফখরুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্ট আসামির মুক্তির বিনিময়ে টাকা লেনদেন নিয়ে কারাগারের বাইরে থাকা স্বজনদের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন ফখরুল ইসলাম। এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেন বন্দিদের জন্য কারা ক্যান্টিনে থাকা মোবাইল ফোন। সংশ্লিষ্ট আসামির সঙ্গে দেনদরবার চূড়ান্ত হলে কারাগারের বাইরে চক্রের নিয়োজিত লোকজনের কাছে টাকা বুঝিয়ে দেন স্বজনরা।
অনুসন্ধানে জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নতুন মামলায় না জড়ানোর শর্তে টাকা আদায়ের কয়েকটি ঘটনার তথ্য জানা গেছে। এর একটি হচ্ছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিনের মুক্তি। জানা যায়, গত ২১ মে সবকটি মামলায় গিয়াস জামিন পান। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মিরসরাই থানায় তিনটি এবং জোরারগঞ্জ থানায় দুটি মামলা ছিল। উচ্চ আদালত থেকে পাঁচটি মামলায়ই গিয়াস উদ্দিনের জামিন-সংক্রান্ত কাগজপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে আসার পর নতুন মামলায় না জড়ানোর মৌখিক শর্তে তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি। ওই দিনই তিনি মুক্তি পান।
টাকা নিয়েও জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে না পারায় টাকা ফেরত দেওয়ার মতো ঘটনার তথ্যও পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। ১২টি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন রিয়াজ নামে এক আসামি। গত ১৪ জুলাই তার জামিন-সংক্রান্ত কাগজপত্র আসে চট্টগ্রাম কারাগারে। নতুন করে আর কোনো মামলায় ‘গ্রেপ্তার’ না দেখানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করে চক্রটি। কিন্তু নগরের কোতোয়ালি থানার সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করতে না পারায় ওই দিন মুক্তি পাননি নাসির উদ্দিন রিয়াজ। জেল গেট থেকে আটক করে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল নগরের কোতোয়ালি থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হওয়া একটি মামলায় (নং ৪০) তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে রিয়াজের স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া সাড়ে ৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
টাকার বিনিময়ে জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের ‘মুক্তি বাণিজ্য’ সম্পর্কে সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্বরত পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই রবিউল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কারাগারের ভেতরে যাই না। জামিন পাওয়া কোনো আসামির ক্লিয়ারেন্সের জন্য কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের মাধ্যমে পুলিশের কাছে তথ্য পাঠায়। কথিত মুক্তি বাণিজ্যে আমরা জড়িত নই।’