হাইকোর্ট বলেছে, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ সংশ্লিষ্ট মা-বাবার তালাক বা বিরোধীয় বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। আদালত আরও বলেছে, বাবা-মায়ের সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক সন্তানের ভরণপোষণে বাবা আইনগতভাবে বাধ্য। বিচারপতি আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি দেওয়ানি রিভিশন মামলা খারিজ করে গত ২২ জুন এ রায় দেয়। রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা গতকাল বৃহস্পতিবার হাতে পেয়েছেন। রায়ে রিভিশন আবেদনকারী নজরুল ইসলামকে গত ১০ বছরের বকেয়া দেনমোহর, সন্তানের ভরণপোষণসহ সমুদয় অর্থ আইন অনুযায়ী পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
মামলার নথির বরাতে আইনজীবীরা জানান, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শেখ নজরুল ইসলামের সঙ্গে হালিমা খাতুনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নজরুল ইসলাম স্ত্রীর কাছে যৌতুক দাবি করেন। এ নিয়ে বিরোধের জেরে হালিমা খাতুন বাবার বাড়িতে চলে যান। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাদের একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তবে, দেনমোহর ও সন্তানের ভরণপোষণ না পেয়ে বাগেরহাটের পারিবারিক আদালতে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেন হালিমা খাতুন। ওই মামলার শুনানিতে বিবাদীপক্ষ (নজরুল ইসলাম) দাবি করে, কোনো যৌতুক চাওয়া হয়নি এবং নজরুল ইসলাম নিয়মিত ভরণপোষণ দিয়েছেন। পাশাপাশি ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্ত্রীকে (হালিমা খাতুন) চূড়ান্ত তালাক দিয়েছেন বলে শুনানিতে জানান নজরুল ইসলাম। তবে, বিবাদীপক্ষ তালাক দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় বাগেরহাটের আদালত বাদীপক্ষে রায় দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম জেলা আদালতে আপিল করলে তা খারিজ হয়ে যায়।
পরে জেলা ও দায়রা আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন বিবাদী নজরুল ইসলাম। ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর সে আবেদনও খারিজ করে হাইকোর্ট। তবে, নজরুল ইসলাম ২০২২ সালে বাগেরহাটের পারিবারিক আদালতে ঘোষণামূলক দেওয়ানি মামলা করেন। আরজিতে তিনি উল্লেখ করেন, হালিমা খাতুনের সঙ্গে তার তালাক কার্যকর হয়েছে।
অন্যদিকে হালিমা খাতুন দেনমোহর ও ভরণপোষণের প্রাপ্যতা বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালে ডিক্রি জারির মামলা করেন। নজরুল ইসলাম তার ঘোষণামূলক মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ডিক্রি জারি কার্যক্রম স্থগিত রাখতে আবেদন করলে ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের জেলা আদালত তা নামঞ্জুর করে। এ আদেশের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলাম হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন মামলা করলে গত ২২ জুন তা খারিজ করে হাইকোর্ট। আদালতে নজরুল ইসলামের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. শহীদুল ইসলাম। হালিমা খাতুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান।
হাইকোর্ট তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। একজন পিতা কেবল তালাক-সংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে তার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।’
রায়ে বলা হয়, ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ, বৈবাহিক অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল পারিবারিক আদালতের। হাইকোর্ট ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারা উল্লেখ করে বলে, ‘লিখিত নোটিসসহ বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া ও তার প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন না করলে তালাক কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা যাবে না। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত না হওয়া কোনো তালাকের আইনি কার্যকারিতা থাকে না এবং তা দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে না। একইভাবে কেবল একটি নতুন ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করার অর্থ এই নয় যে, তা আগের কোনো মামলায় হওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়নকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করতে পারবে।’ আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘যদি আগে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা আগে প্রদত্ত ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তাকে মুক্তি দেয় না।’