সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ধর্মীয় রীতি, আচার ও বর্ণাঢ্য রথযাত্রার মধ্য দিয়ে উৎসবমুখ পরিবেশে ৯ দিনের এ উৎসব শুরু হয়। আগামী ২৫ জুলাই উল্টোরথ যাত্রার মধ্য দিয়ে এ উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। সনাতনদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জগন্নাথদেব জগতের নাথ বা অধীশ্বর। জগৎ হচ্ছে বিশ্ব ব্রহ্মা-। আর নাথ হচ্ছেন ঈশ্বর। এর আলোকে জগন্নাথ হচ্ছেন জগতের ঈশ্বর। জগন্নাথের অনুগ্রহ পেলে মানুষের কল্যাণ ও মুক্তিলাভ হয়। চিরাচরিত এই বিশ্বাস থেকে রথের ওপর জগন্নাথদেব প্রতিমা রেখে তাকে সাজিয়ে রথ টেনে নিয়ে যাত্রা করেন সনাতন ধর্ম অনুসারীরা।
গতকাল সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) মন্দিরে বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মধ্য দিয়ে রথযাত্রা মহোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দুপুর ১টার পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে বেলা ৩টায় স্বামীবাগ মন্দির থেকে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুরু হয়। এটি জয়কালী মন্দির হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর, পল্টন মোড়, সচিবালয় মেট্রো স্টেশন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হয়। এতে বিভিন্ন বয়সী সনাতন ধর্মাবলম্বী হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। এ সময় রথ থেকে প্রসাদস্বরূপ ভক্তদের বিভিন্ন ফলমূল বিতরণ করা হয়।
চট্টগ্রামে রথযাত্রায় সম্প্রীতির বার্তা : চট্টগ্রাম নগরীর নন্দনকানন ঐতিহাসিক রথের পুকুরপাড় এলাকায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব কেন্দ্রীয় রথযাত্রা। বৃহস্পতিবার বিকেলে উৎসব কেন্দ্র করে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, সনাতনীদের রথযাত্রা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সব সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে। তুলসীধাম একটি ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান। এখানকার ৩০০ বছরের প্রাচীন কেন্দ্রীয় রথযাত্রা আজ সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।
ঋষিধাম অধিপতি ও তুলসীধামের মোহন্ত শ্রীমৎ দেবদীপানন্দ পুরী মহারাজের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি ঐতিহ্য রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, নন্দনকাননের ঐতিহাসিক রথের পুকুরপাড় দখল করে কোনো প্রভাবশালীকেই স্থাপনা গড়তে দেওয়া হবে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, একটি গোষ্ঠী নানা অজুহাতে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদ। আমাদের রাষ্ট্র এবং সংবিধানে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
রথযাত্রার উদ্বোধক ও চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাইকমিশনার শ্রী হরিশ কুমার বলেন, রথযাত্রা হলো ভগবানের বিশেষ কৃপার প্রকাশ। এ সময় ভগবান মন্দির থেকে রাজপথে অবতীর্ণ হন, তাই এটি সর্বজনীন করুণার উৎসব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দীপক কুমার পালিত বক্তব্য দেন। স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন যথাক্রমে উদযাপন কমিটির সভাপতি হিরন্ময় ধর ও সাধারণ সম্পাদক বিধান ধর। অ্যাডভোকেট সুজন কান্তি দে ও অনুপম দেবনাথ পাভেলের সঞ্চালনায় সনাতনী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দও এতে বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভা শেষে তুলসীধামের মোহন্ত মহারাজের নেতৃত্বে অতিথিরা রথের দড়ি টেনে রথপরিক্রমার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর আগে ঢোলক বাদ্য, মঙ্গল শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রকে রথারোহণ করানো হয়।