ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় পরিসংখ্যান দিয়ে অনেক খেলোয়াড়কেই মাপা যায়, কিন্তু খেলাটির ব্যাকরণকে যিনি রূপকথার সৌন্দর্যে রূপ দিয়েছিলেন, তিনি একজনই—স্যার গারফিল্ড সেন্ট অব্রুন সোবার্স। ক্রিকেট বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স ৮৯ বছর বয়সে বার্বাডোসে নিজের বাসভবনে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আগামী ২৮ জুলাই তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তার মাত্র ১১ দিন আগেই থামলো এই কিংবদন্তির মহাকাব্যিক পথচলা।
বাঁহাতি ব্যাটিংয়ের ধ্রুপদী আভিজাত্য, ক্ষিপ্র গতির পেস বোলিং থেকে শুরু করে জাদুকরী রিস্ট-স্পিন, আর উইকেটের একদম কাছে চিতার মতো ফিল্ডিং—সব মিলিয়ে কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান তাঁকে যথার্থই আখ্যা দিয়েছিলেন **"ফাইভ-ইন-ওয়ান ক্রিকেটার"** হিসেবে।
অভাব অনটন থেকে বিশ্বজয়ের গল্প
১৯৩৬ সালে বার্বাডোসের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন সোবার্স। মাত্র ৫ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবাকে হারান, যাঁর পণ্যবাহী জাহাজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান ইউ-বোটের টর্পেডোর আঘাতে সাগরে ডুবে গিয়েছিল। রাস্তায় রাস্তায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোচ ছাড়াই টেনিস বল ও পিচ গলিয়ে বানানো বল দিয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন সোবার্স। তাঁর জন্মগত একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল—দুই হাতেই একটি করে অতিরিক্ত ষষ্ঠ আঙুল ছিল, যা কৈশোরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাবের নেটে বোলিং শুরু করার ৫ বছরের মাথায় (১৭ বছর ২৪৫ দিন বয়সে) ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়।
একাই সামলেছেন দুই বন্ধুর দায়িত্ব
সোবার্সের ক্রিকেটীয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ১৯৫৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। ল্যাঙ্কাশায়ার থেকে লন্ডন যাওয়ার পথে সোবার্সের চালানো গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে তাঁর পরম বন্ধু ও সমকক্ষ প্রতিভাবান ক্যারিবীয় অলরাউন্ডার কলি স্মিথ নিহত হন। এই শোক সোবার্সকে চরম বিষণ্ণতা ও মদের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর তিনি উপলব্ধি করেন—দেশ কলি স্মিথকে হারিয়েছে, এখন যদি তিনিও হারিয়ে যান তবে দেশের ক্রিকেটের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
সোবার্স তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, 'হঠাৎ আমার মনে হলো, আমি আর শুধু গ্যারফিল্ড সোবার্সের জন্য খেলব না। আমাকে দুজনের দায়িত্ব পালন করতে হবে—কলির এবং আমার নিজের।' এরপর থেকেই ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর স্বর্ণযুগের সূচনা হয়।
অনন্য রেকর্ড ও ক্রিকেটীয় রাজকীয়তা
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ২১ বছর বয়সে অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন তিনি, যা দীর্ঘ ৩৬ বছর অক্ষত ছিল। ১৯৬৮ সালে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে টানা ৬টি বলে ৬টি ছক্কা মেরে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি।
টেস্ট ও ওয়ানডে পরিসংখ্যান: ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচে তিনি ৫৭.৭৮ গড়ে ৮,০৩২ রান করেছেন এবং ৩৪.০৩ গড়ে ২৩৫টি উইকেট নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটের একদম শুরুর যুগে ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি ক্যারিয়ারের একমাত্র ওয়ানডে ম্যাচটি খেলেন।
প্রথম শ্রেণরি ক্রিকেট: বার্বাডোস, নটিংহামশায়ার ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মোট ৩৮৩টি প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচে তিনি ৫৪.৮৭ গড়ে ২৮,৩১৪ রান এবং ২৭.৭৪ গড়ে ১,০৪৩টি উইকেট শিকার করেন।
বিতর্ক ও জীবনের শেষভাগ
সোবার্সের মাঠের ক্রিকেট যতটা নিখুঁত ছিল, মাঠের বাইরের জীবন এবং অধিনায়কত্ব ততটা নিষ্কণ্টক ছিল না। তাঁর সরল রাজনৈতিক বোঝাপড়ার কারণে ১৯৭০ সালে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ শাসিত রোডেশিয়ায় (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) খেলতে গিয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন এবং সাময়িকভাবে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অপ্রিয় ব্যক্তি ঘোষিত হন। ক্যারিয়ারের শেষভাগে ও অবসরের পর মদ্যপান এবং ঘোড়দৌড়ের জুয়ায় আসক্তির কারণে বড় অঙ্কের ঋণের মুখে পড়লে বার্বাডোস সরকার তাঁকে সেই ঋণ থেকে উদ্ধার করে। ৩৯টি টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দিলেও তাঁর আক্রমণাত্মক ও স্পোর্টিং ডিক্লারেশনের কারণে কিছু ম্যাচ হারতে হয়, ফলে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর রেকর্ড (৯ জয়, ১০ হার, ২০ ড্র) তাঁর প্রতিভার তুলনায় কিছুটা ম্লান ছিল।
এক অলৌকিক নক্ষত্রের বিদায়
১৯৭৫ সালে ক্রিকেটে অবদানের জন্য রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক নাইটহুড লাভ করা সোবার্সকে ২০০০ সালে উইজডেন শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন হিসেবে নির্বাচিত করে।
আজকের ক্রিকেট বাণিজ্য, স্লেজিং আর জটিল কৌশলে বন্দি। কিন্তু স্যার গ্যারি সোবার্স ছিলেন এমন এক যুগের প্রতিনিধি যখন ক্রিকেট ছিল নিখাদ বিনোদন ও খেলোয়াড়ি সুলভ আচরণের প্রতীক। তিনি মাঠে নামলে বার্বাডোসের উষ্ণ বাতাস যেন ছুঁয়ে যেত গ্যালারিকে। ব্যাট হাতে তাঁর সেই রাজকীয় ফলো-থ্রু আর বল হাতে বহুমাত্রিক জাদু আর কখনোই দেখা যাবে না। ক্রিকেট রোমান্টিকদের হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরন্তন এক রাজপুত্র হয়ে।